📚 উত্তরসহ মাধ্যমিক ইতিহাস লাস্টমিনিট সাজেশন-২০২৬(প্রশ্নের মান-২,৪,৮)-১০০% কমন আসবেই আসবে 📚
Prepared by
KABIR SIR
বিভাগ—গ:
৩. দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও ( যে-কোনো ১১টি ) ২x১১=২২
৩.১ সামাজিক ইতিহাস কী ?
Ans. ১৯৬০ এর দশক থেকে এডওয়ার্ড থমসন, এরিক হবসম, লুসিয়েন ফেবর, মার্ক ব্লখ প্রমুখ ঐতিহাসিকদের হাত ধরে জন্ম নেয় নতুন সামাজিক ইতিহাস । দরবারি ইতিহাসের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সামাজিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ধর্ম-সংস্কৃতি এভাবে সামগ্রিক যাপনের কথা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সামাজিক ইতিহাস চর্চায় । হ্যারল্ড পার্কিন, রণজিৎ গুহ, পার্থ চ্যাটার্জি, শাহিদ আমিন প্রমুখরা এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলেন ।
৩.২ ইতিহাসের উপাদানরূপে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কী ?
Ans. আধুনিক ইতিহাস রচনায় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ, সম্পাদকীয়, চিঠিপত্র, নানা বিষয়ের ওপর প্রকাশিত লেখাগুলি ইতিহাস রচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । অন্যান্য উপাদানের সাথে তুলনা করে সংবাদপত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদি প্রাথমিক উপাদানরূপে বিবেচিত হয় । সমকালীন সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির বার্তাবহ সংবাদপত্র ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও আধুনিক ভারতের গঠনের ইতিহাস রচনায় বিশেষ সহায়ক ।
৩.৩ বাংলার নারী শিক্ষা বিস্তারে রাজা রাধাকান্ত দেবের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো ।
Ans. ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রাজা রাধাকান্ত দেব সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন । হিন্দু কলেজ, স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় অন্যতম উদ্যোগী রাজা রাধাকান্ত দেব নারীশিক্ষার বিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন । বেথুন স্কুল, ডাফ স্কুল গঠনে, নারীদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত করতে বিভিন্ন সভা আয়োজনে রাধাকান্ত দেব বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন ।
৩.৪ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ বিভক্ত হল কেন ?
Ans. ব্রাহ্মসমাজ ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে সংস্কারের প্রশ্নে আদি ও ভারতবর্ষীয় এই দুভাগে বিভক্ত হয়েছিল । কেশবচন্দ্র সেনের খ্রিষ্টধর্ম প্রীতি, গুরুবাদের প্রতি আসক্তি, ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে নিজের নাবালিকা কন্যা সুনীতিদেবীর সাথে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের বিবাহদানের প্রশ্নে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজে কেশব সেনের অনুগামী ছিলেন যারা, তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় । ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে আচার্য করে শিবনাথ শাস্ত্রীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ । অন্যদিকে কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে 'নববিধান' ব্রাহ্মসমাজে পরিণত হয় ।
৩.৫ ফরাজি আন্দোলন কি ধর্মীয় পুনর্জাগরণের আন্দোলন ?
Ans. ইসলামের সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনের আদর্শ নিয়ে ফরাজি আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল । 'ফরাজি' শব্দের অর্থ ইসলামের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য । ইসলাম শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হাজি শরিয়ত উল্লাহ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে কোরান নির্দেশিত পথে ধর্মসংস্কারের জন্য এই আন্দোলনের সূচনা করেন । আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কারণ হিন্দু জমিদার কর্তৃক ধর্মীয় কারণে ফরাজিদের উপর অতিরিক্ত ধর্মীয় 'কর' বা 'আবওয়াব' আদায় । তবে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দমননীতির কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হয় । ফরাজিদের শক্তির উৎস ছিল ধর্মীয় ঐক্য কিন্তু অবধারিতভাবে এটি একটি কৃষক অভ্যুত্থান ।
৩.৬ নীলকররা নীলচাষিদের ওপর কীভাবে অত্যাচার করত তা সংক্ষেপে আলোচনা করো ।
Ans. ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলকর সাহেবদের সীমাতীত অত্যাচার ও শোষণের প্রতিবাদে কৃষকরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে । নীলকররা নীলচাষীদের নানাভাবে অত্যাচার করত, যেমন— নীলকুঠিতে ধরে এনে নীল চাষে বাধ্য করা হত, প্রহার করা হত, হত্যা করা হত, কৃষকেরা নীল চাষে বাধ্য না হলে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিত, কৃষকদের স্ত্রী ও কন্যাদের সম্মানে হাত দিতেও পিছপা হত না ।
৩.৭ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে 'সভাসমিতির যুগ' বলা হয় কেন ?
Ans. উনবিংশ শতকে ব্রিটিশদের উদ্যোগে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং ভারতবর্ষের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে । মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা সম্ভব নয় । এর একমাত্র উপায় হল ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলন করা । এই উদ্দেশ্য সেই সময় বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে অনেক সভা সমিতি গড়ে ওঠে । এই কারণে ডঃ অনিল শীল উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে 'সভা সমিতির' যুগ বলে অভিহিত করেছেন ।
৩.৮ 'আনন্দমঠ' উপন্যাস কীভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে উদ্দীপ্ত করেছিল ?
Ans. সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিপুল প্রসার ঘটে । আনন্দমঠের সন্তানদের উচ্চারিত 'বন্দে মাতরম' সংগীত বিপ্লবীদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল । এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র পরাধীন ভারতমাতার দুর্দশার চিত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে দেশবাসীকে মুক্তি আন্দোলনে আন্দোলিত করেন । সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহের জ্বলন্ত দলিল স্বরূপ 'আনন্দমঠ' দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিল ।
৩.৯ উনিশ শতকে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশে 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স' -এর ভূমিকা কী ছিল ?
Ans. ঊনিশ শতকে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশের জন্য মহেন্দ্রলাল সরকার ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স' প্রতিষ্ঠা করেন । এই বিজ্ঞান কেন্দ্রে সম্পূর্ণ নিজের তত্ত্বাবধানে স্বাধীনভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে মৌলিক গবেষণার ব্যবস্থা করা হয় ও বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতার আয়োজন করা হয় । এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলা হয় ।
৩.১০ 'বিশ্বভারতী' প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল ?
Ans. কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২১ সালে বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে স্নিগ্ধপল্লী প্রকৃতির বুকে 'বিশ্বভারতী' প্রতিষ্ঠা করেছিল । এই 'বিশ্বভারতী' প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমিক শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষাচেতনার সম্মিলন, শিক্ষার্থীর জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করা, শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয় গড়ে তোলা, আদর্শশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মৌলিক নীতিরূপ স্বাধীনতা, সৃজনশীলতার বিকাশ ।
৩.১১ নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ?
Ans. ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে বোম্বাইতে নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় । এর উদ্দেশ্য গুলি হল—
(i) বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলনের কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করা ।
(ii) বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধী শ্রমিক আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেওয়া ।
(iii) শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করা ।
(iv) শ্রমিকদের সমাজতন্ত্রী ভাবধারার সাথে যুক্ত করা ।
৩.১২ 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি' কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ?
Ans. শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা কমানো, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ করা, জমিদারি প্রথার অবসান ঘটানো এবং পুনরায় নতুনভাবে শ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর মাসে 'ওয়ার্কার্স এন্ড পেজেন্টস পার্টি' গড়ে উঠেছিল । মুজফফর আহমেদ, কাজি নজরুল ইসলাম প্রমুখের নেতৃত্বে 'লাঙ্গল' ও 'গণবাণী' পত্রিকাকে মুখপত্র করে প্রাথমিকভাবে কংগ্রেসের মধ্য থেকে ও পরবর্তীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তভাবে শ্রমিক কৃষকদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।
৩.১৩ রশিদ আলি দিবস কেন পালিত হয়েছিল ?
Ans. আজাড হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলির দিল্লির লালকেল্লায় বিচার শুরু হলে তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় । এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ থেকে ১৩ই ফেব্রুয়ারি কলকাতা গণ আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে । ১১ই ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা কলকাতার রাজপথে আন্দোলনে নামে এবং প্রতিবাদ দিবস রূপে ১২ই ফেব্রুয়ারি দিনটি রশিদ আলী দিবস হিসাবে পালন করা হয় ।
৩.১৪ দলিত কাদের বলা হয় ?
Ans. ব্যাকরণ অনুযায়ী 'দলিত' শব্দটি একটি বিশেষণ, যার অর্থ মাড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এমন বা পদ দলিত । ১৯৩০ -এর দশক থেকে অস্পৃশ্যরা নিজেদের দলিত বলে পরিচয় দিতে শুরু করে । এরা হল বর্ণ হিন্দু সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন । এরা সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের কাছে অত্যাচারিত হত । ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে দলিত আন্দোলন বৃহত্তর রূপ নেয় ।
৩.১৫ দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তি দলিল বলতে কী বোঝায় ?
Ans. ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার দেশীয় রাজ্যগুলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে এক বলিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করেছিল । ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে জুন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের অধীনে স্থাপিত হয় দেশীয় রাজ্য দপ্তর এবং এর সচিব হন ভি.পি.মেনন । প্যাটেল মাউন্টব্যাটেনের পরামর্শে প্রায় সমস্ত দেশীয় রাজ্যগুলিকে বিশাল পরিমাণ ভাতা, খেতাব ও অন্যান্য সুবিধার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে "Instrument of Accession' নামে একটি দলিলে স্বাক্ষর করে ভারত ইউনিয়নে যোগদান করান । এটিই দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির দলিল নামে পরিচিত ।
৩.১৬ ১৯৫০ সালে কেন নেহেরু-লিয়াকৎ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল ?
Ans. ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার পর ভারতের কাছে প্রধান সমস্যা ছিল 'উদ্বাস্তু সমস্যা' । পাকিস্তান থেকে ভারতে বহু শরণার্থী চলে আসে এবং ভারত থেকে পাকিস্তানে বহু শরণার্থী চলে যায় । দাঙ্গা বহুল এই সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য ১৯৫০ সালের ৮ই এপ্রিল নেহেরু-লিয়াকৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এর মাধ্যমে ভারত সরকার ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে উদ্যোগী হয় ।
৩.১৭ পরিবেশের ইতিহাসের গুরুত্ব কী ?
Ans. মানুষ পরিবেশের উপর নির্ভরশীল । প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণ এবং তার উপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার মানব সভ্যতাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে । প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার এবং লুণ্ঠন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে । তারই প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন । যেমন— চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন । সেজন্য পরিবেশ সচেতনতার লক্ষ্যে ইতিহাসে পরিবেশের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ।
৩.১৮ স্মৃতিকথা অথবা আত্মজীবনীকে কীভাবে আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার উপাদানরূপে ব্যবহার করা হয় ?
Ans. ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে স্মৃতিকথা এবং আত্মজীবনীতে লেখকের ব্যক্তিগত আবেগ অপেক্ষা সমকালীন সমাজ সংস্কৃতির বস্তুনিষ্ঠ বিবরণই প্রধান বিবেচ্য । যেমন— সরলা দেবী চৌধুরানীর আত্মজীবনী 'জীবনের ঝরাপাতা' এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথা 'জীবনস্মৃতি' -তে শুধু ঠাকুর পরিবারের কথা নয় সমকালীন বিশ শতকের কলকাতার সমাজ সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিবরণও পাওয়া যায় ।
৩.১৯ 'মেকলে মিনিট' কি ?
Ans. ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত আকার ধারণ করে । এমতাবস্থায় জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে পাশ্চাত্য শিক্ষার স্বপক্ষে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন পেশ করেন তা 'মেকলে মিনিট' নামে পরিচিত । মেকলের মতে— প্রাচ্য শিক্ষা নীতিহীন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত । তার মতে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটবে এবং এই শিক্ষা সমাজের উঁচুতলা থেকে চুঁইয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে ।
৩.২০ সমাজ সংস্কারে নব্যবঙ্গদের ভূমিকা কী ছিল ?
Ans. হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডিরোজিও এবং তার অনুগামী ছাত্ররা যাঁরা ইয়ংবেঙ্গল নামে পরিচিত ছিলেন তাঁরা হিন্দু ধর্মের প্রচলিত কুসংস্কার ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতা করেছিলেন । এঁরা মূলত যুক্তিবাদী ও প্রগতিপন্থী ছিলেন । তাঁরা যেমন মূর্তি পূজা, উপবীত ধারণের বিরোধিতা করেছিলেন তেমন স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, বাক স্বাধীনতার স্বপক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন ।
৩.২১ দুদু মিঞা স্মরণীয় কেন ?
Ans. ফরাজি আন্দোলনের অন্যতম নেতা দুদু মিঞা একদিকে যেমন জমিদার এবং মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন অন্যদিকে বাংলার নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন । তিনি প্রচলিত কর কাঠামো ও বে-আইনি কর আদায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন এবং প্রচার করেন, "জমি যারা চাষ করে জমি তাদের" । তিনি বাংলার বেশ কিছু স্থানে অস্থায়ী সমন্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন ।
৩.২২ নীল বিদ্রোহে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা কীরূপ ছিল ?
Ans. 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর পত্রিকায় একদিকে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন এবং অন্যদিকে নীলকর বিরোধী জনমত গঠনে প্রয়াসী হয়েছিলেন । সাধারণ কৃষকদের উপর নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার, দাদন প্রথা, উর্বর জমিতে বলপূর্বক নীলচাষে কৃষকদের বাধ্য করা প্রভৃতি বিষয় তাঁর পত্রিকায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন । তিনি তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সংগঠিত করেন ।
৩.২৩ 'মহারানীর ঘোষণাপত্র' -এর (১৮৫৮) মূল উদ্দেশ্য কী ছিল ?
Ans. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পরিপেক্ষিতে মহারানীর ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি কর্তৃক ভারতের প্রত্যক্ষ শাসনভার গ্রহণ করা । দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ সরকারের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে ভারতবাসীর যোগসাধন ঘটানো ।
৩.২৪ ব্যঙ্গচিত্র কেন আঁকা হয় ?
Ans. চিত্রশিল্পের অন্যতম শাখারূপে ব্যঙ্গচিত্রে মূলত তির্যক বা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, ত্রুটিবিচ্যুতিকে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয় । অত্যন্ত সরল ভঙ্গিতে সমাজের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি সংস্কৃতির ত্রুটিগুলিকে আক্রমণ করা হয় । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা, 'বাবু' সমাজের ভণ্ডামি এবং ধর্মীয় দ্বিচারিতা কে তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন ।
৩.২৫ বাংলার ছাপাখানার বিকাশে পঞ্চানন কর্মকারের ভূমিকা কী ছিল ?
Ans. প্রথম বাংলা ভাষার ছাপাখানার হরফ নির্মাণের অন্যতম রূপকার ছিলেন মিশনারি প্রেসের চার্লস উইলকিন্সের সহযোগী পঞ্চানন কর্মকার । তিনি বাংলা ভাষার সচল ধাতু হরফের ঢালাই ও ছেনিকাটা আকার নির্মাণে প্রধান রূপকার ছিলেন । এর মাধ্যমে অল্প সময়ে কম খরচে ছাপা শিল্পের ব্যবসায়িক বিকাশ ঘটেছিল । তিনি দেবনাগরী ভাষায় মার্জিত সংস্কৃত ব্যাকরণ ছাপার উদ্যোগ নেন ।
৩.২৬ বাংলার মুদ্রণের ইতিহাসে বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব কী ?
Ans. আপার চিৎপুর রোডের বড়তলা প্রকাশনা ছিল কলকাতার আদি প্রকাশনা শিল্প । এখানে মূলত হ্যান্ডমেড পেপারে ছাপচিত্রের মাধ্যমে স্বদেশী কারিগরেরা চটি বই, পুঁথি, পাঁচালী প্রকাশ করত । এখান থেকে অনুবাদ সাহিত্যও প্রকাশিত হত । উনিশ শতকের কলকাতা ও 'বাবু' সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য এখান থেকে পাওয়া যায় ।
৩.২৭ 'একা' আন্দোলন শুরু হয় কেন ?
Ans. ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ অঞ্চলে মাদারি পাসির নেতৃত্বে 'একা' আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল । কৃষকেরা মূলত অত্যধিক রাজস্ব বৃদ্ধি, বাড়তি কর আদায়, জমি থেকে অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ, বেগার শ্রমদানের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল ।
৩.২৮ বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন কেন শুরু হয় ?
Ans. ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকের কৃষকরা বৃহত্তর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে । নিম্নবর্ণের কৃষক কালিপরাজদের উপর উচ্চবর্ণের কৃষক উজলিপরাজদের অত্যাচারে কৃষকরা ক্ষুব্ধ ছিল । এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার রাজস্বের পরিমাণ ২৭ থেকে ৩০ পর্যন্ত বৃদ্ধি করলে, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলোর দাম পড়ে গেলে এবং জলসেচের সংকট দেখা দিলে কৃষকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে ।
৩.২৯ অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠা হয় ?
Ans. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে ছাত্র সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য লর্ড কার্জনের শিক্ষা সচিব কার্লাইল ১৯০৫ সালের অক্টোবর মাসে যথাক্রমে কার্লাইল সার্কুলার, লিয়ন সার্কুলার, পেডলার সার্কুলার জারি করেন । এর প্রত্যুত্তরে ছাত্রনেতা শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি গঠন করেন । এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারি বিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত ছাত্রদের বিকল্প শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা এবং ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশ প্রেম জাগ্রত করা ।
৩.৩০ দীপালি সংঘ কেন প্রতিষ্ঠিত হয় ?
Ans. ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে লীলা নাগ (রায়) দিপালী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন । মেয়েদের শিক্ষিত, আত্মসচেতন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে এবং স্বদেশ প্রেম ও বৈপ্লবিক চিন্তা ও চেতনার উন্মেষ ঘটাতে এই সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয় । প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এই সংঘের সঙ্গে প্রথম দিকে যুক্ত ছিলেন
৩.৩১ কী পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন ?
Ans. কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংহ ভারত বা পাকিস্তানে কোথাও যোগ না দিয়ে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিলেন । এমতাবস্থায় পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে কাশ্মীরের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয় । তখন হরি সিং ভারতের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারের পিছু হঠতে বাধ্য করে ।
৩.৩২ রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়েছিল ?
Ans. ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি উঠতে শুরু করে । এই দাবির যৌক্তিকতা বিচারের জন্য ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে স্বরাষ্ট্র দফতরের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ ফজল আলির সভাপতিত্বে কে. এম. পানিকর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জুরকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়েছিল ।
৩.৩৩. আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা গুরুত্বপূর্ণ কেন ?
Ans. ভৌগলিক দিক থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলের স্থানীয় ব্যক্তি বা বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইতিহাস হল স্থানীয় ইতিহাস, যা আঞ্চলিক ও জাতীয় ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ে সাহায্য করে এবং আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস রচনার যোগসূত্র ও তথ্যসূত্রের যোগান দেয় । ইতিহাসের বৃহত্তর আলোচনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি উপেক্ষিত থেকে যায় আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে তার সার্বিক প্রকাশ ঘটে, যার ফলে সমগ্র ইতিহাস জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।
৩.৩৪. 'সরকারি নথিপত্র' বলতে কী বোঝায় ?
Ans. আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে 'সরকারি নথিপত্র' -র ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই সকল উপাদান থেকে সেই সময়কার ভারতীয় সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক তথ্যসূত্র পাওয়া যায় । তৎকালীন সরকারি নথিপত্র হল—(১) পুলিশ বিভাগের রিপোর্ট ও জরুরি চিঠিপত্র, (২) গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট ও বিভিন্ন তথ্য এবং (৩) সরকারি আধিকারিকদের প্রতিবেদন ও চিঠিপত্র যা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সার্বিক ইতিহাস তথ্যসূত্রের যোগান দেয় । স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের মহাফেজখানা সহ আদালতগুলিতে সংরক্ষিত রিপোর্ট এবং সরকারি আধিকারিকদের চিঠিপত্র যা থেকে ভারত-ইতিহাসের বহু তথ্য পাওয়া যায় ।
৩.৩৫. সংবাদপত্র এবং সাময়িক-পত্রের মধ্যে পার্থক্য কী ?
Ans. ♦ রোজকার ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হয়ে থাকে দৈনিক সংবাদপত্রে । সংবাদপত্র মূলত প্রতিবেদনমূলক, অন্যদিকে সাময়িকপত্র হল বিশ্লেষণধর্মী এবং এটি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, এমন কি বার্ষিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে থাকে ।
♦ সংবাদপত্র সস্তা দামের কাগজে বাঁধাইহীন ভাবে প্রকাশিত হয় । অন্যদিকে সাময়িকপত্র তুলনামূলক দামি কাগজে বাঁধাই আকারে প্রকাশিত হয় ।
♦ দৈনিক সংবাদপত্রের একটি উদাহরণ হল 'সংবাদ প্রভাকর' । সাময়িকপত্রের উদাহরণ হল 'বঙ্গদর্শন' ও' সোমপ্রকাশ' ।
৩.৩৬. মধুসূদন গুপ্ত কে ছিলেন ?
Ans. মধুসূদন গুপ্ত কলিকাতা মেডিকেল কলেজের একাধারে ছাত্র ও শিক্ষক ছিলেন । এখানে থাকাকালীন সমস্ত রকম সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি তিনি এখানে প্রথম বাঙালি ছাত্র হিসাবে 'শব ব্যবচ্ছেদ' করেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ । ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে এখান থেকে তিনি ডাক্তারী পাশ করেন । তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ হল বাংলায় 'লন্ডন ফার্মাকোপিয়া' এবং সংস্কৃতে হুপারের 'Anatomist's Vade Mecum' ।
৩.৩৭. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হল কেন ?
Ans. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণগুলি হল— (ক) ব্রিটিশ সরকারের চরম দমন-পীড়ন নীতি, (খ) সাংগঠনিক দুর্বলতা, (গ) সমাজের বৃহত্তর অংশ তথা সাধারণ মানুষের বিদ্রোহে সামিল না হওয়া, (ঘ) পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক চরিত্র এই বিদ্রোহকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে ।
৩.৩৮. নীল বিদ্রোহে খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা কিরূপ ছিল ?
Ans. খ্রিস্টান মিশনারিরা সর্বপ্রথম নীলকরদের কার্যকলাপের প্রকাশ্য সমালোচনা করে শিক্ষিত সমাজকে জাগরিত করেছিল । চার্চ মিশনারিদের মধ্যে থেকে জে. জে. লিংকে, ফ্রেডারিক সুর এবং বামওয়েচ নীলকরদের অত্যাচারের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছিলেন । আলেকজান্ডার ডাফ জেমস লং প্রমুখ মিশনারিদের সমর্থন করেছিলেন । সেই সময় রেভারেন্ড জেমস লং নিজ নামে 'নীলদর্পণ' নাটকের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে ব্রিটিশ সরকারের কোপে পড়েন ।
৩.৩৯. জমিদারসভা ও ভারতসভার মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো ।
Ans. ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত জমিদারদের স্বার্থে সংরক্ষিত একটি আঞ্চলিক সংগঠন । ভারতসভা হল ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের রাজনৈতিক সংগঠন এবং এটি আঞ্চলিক চরিত্র থেকে সর্বভারতীয় চরিত্রলাভ করে ও কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন ।
৩.৪০. উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে 'ভারতমাতা' চিত্রটির কীরূপ ভূমিকা ছিল ?
Ans. ওয়াশ চিত্ররীতিতে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতা চিত্রটি আঁকেন, যার প্রথম নাম ছিল বঙ্গমাতা, পরে ভগিনী নিবেদিতা এর নামকরণ করেন ভারতমাতা । ভারতমাতা চিত্রের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্রের বিমূর্ত জাতীয়তাবাদ মূর্ত হয়ে উঠেছিল । মাতৃমূর্তি বেদ, ধানের আঁটি, সাদা কাপড় এবং জপের মালা ধারণ করে আছেন যার অর্থ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, দীক্ষা, যা সন্তানের প্রতি মায়ের দান, যা দেশমাতার শৃঙ্খল মুক্তিতেই একমাত্র পাওয়া সম্ভব । এই চিত্রটি জাতীয়তাবোধের প্রসারে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল ।
৩.৪১. চার্লস উইলকিনস কে ছিলেন ?
Ans. বাংলা ছাপা হরফের যথার্থ পরিকল্পনা করেছিলেন চার্লস উইলকিন্স । তিনিই প্রথম ছেনিকাটা বাংলা হরফের নির্মাণ করেছিলেন বলে তাঁকে 'বাংলার মুদ্রণ শিল্পের জনক' বলা হয় । পরে হেস্টিংসের অনুরোধে হুগলির পঞ্চানন কর্মকারের সাহায্যে তিনি ছেনিকাটা হরফ নির্মাণ করেন ও সরকারি ছাপাখানার দায়িত্ব নেন । হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ তাঁর দ্বারাই ছাপা হয় এবং এজন্য তাঁকে 'বাংলার গুটেনবার্গ' বলা হয় ।
৩.৪২. বাংলা লাইনোটাইপ প্রবর্তনের গুরুত্ব কী ?
Ans. 'লাইন অফ টাইপ' থেকে লাইনোটাইপ কথাটি এসেছে, যেটি আদতে একটি কম্পোজিং মেশিন, যার সাহায্যে হাতের বদলে মেশিনে অত্যন্ত দ্রুত ও সুচারুরূপে চলমান ধাতব হরফ স্থাপন করা যেত । বাংলায় ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সুরেশচন্দ্র মজুমদার, রাজশেখর বসু প্রমুখের উদ্যোগে এই প্রযুক্তিতে সংবাদপত্র ছাপা শুরু হয় ।
৩.৪৩. কৃষক আন্দোলনের বাবা রামচন্দ্রের কীরূপ ভূমিকা ছিল ?
Ans. বাবা রামচন্দ্র যুক্তপ্রদেশের কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন । অহিংস অসহযোগ আন্দোলনকালে বেগারশ্রম, অতিরিক্ত কর, জমি বেদখল প্রভৃতির বিরুদ্ধে কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে তিনি খাজনা বন্ধের আন্দোলন শুরু করেন । কৃষকদের সংগঠিত করার জন্য তিনি ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে 'অযোধ্যা কিষাণ সভা' প্রতিষ্ঠা করেন ।
৩.৪৪. মাদারি পাশি কে ছিলেন ?
Ans. মাদারি পাশি অসহযোগ আন্দোলনকালে যুক্তপ্রদেশের বিশিষ্ট কৃষক নেতা ছিলেন । যুক্তপ্রদেশের হরদই, বারাবাকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি জেলার কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে অতিরিক্ত কর আদায়ের ক্ষেত্রে অত্যাচার, বেগারশ্রম প্রভৃতির বিরুদ্ধে 'একা' বা 'একতা' আন্দোলন শুরু করেন । ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের মধ্যে সরকার চরম দমননীতি প্রয়োগ করে এই আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয় ।
৩.৪৫ মাতঙ্গিনী হাজরা স্মরণীয় কেন ?
Ans. ভারত ছাড়ো আন্দোলনকালে বাংলায় সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে গঠিত তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের অধীনে একটি নারী বাহিনী গঠিত হয় । এই নারীবাহিনীর অন্যতম সদস্যা ছিলেন ৭৩ বছরের বৃদ্ধা 'গান্ধিবুড়ি' মাতঙ্গিনী হাজরা । যার নেতৃত্বে তমলুক থানা ঘেরাও কর্মসূচি গৃহীত হয় এবং পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন । ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এই দুঃসাহসিক কাজের জন্য তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় ।
৩.৪৬ দলিত কাদের বলা হয় ?
Ans. 'দলিত' শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থ দলন বা বলপূর্বক দমিয়ে রাখা । ব্রিটিশ শাসনে ভারতের নিপীড়িত, শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষদের দলিত বলা হয় । গান্ধীজি এদেরকে 'হরিজন' বলতেন । সাধারণত মাহার, নাদার, চামার, নমশূদ্র, প্রমুখরা দলিত নামে পরিচিত ছিল । স্বাধীনতার পর এদেরকে তপশিলি জাতি ও উপজাতি হিসেবে ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃতি দিয়েছে
৩.৪৭. দার কমিশন (১৯৪৮) কেন গঠিত হয়েছিল ?
Ans. স্বাধীনতার পর ভাষাভিত্তিক রাজ্যগঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠলে এর যৌক্তিকতা বিচারের উদ্দেশ্যে ভারত সরকার এস. কে. দার -এর নেতৃত্বে 'ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন' গঠন করে, যা 'দার কমিশন' নামে পরিচিত । এই কমিশন তার রিপোর্টে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠনে তীব্র আপত্তি জানায়, কারণ তাঁরা মনে করতেন ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠিত হলে দেশের জাতীয় ঐক্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত হবে ।
৩.৪৮. পত্তি শ্রীরামুলু কে ছিলেন ?
Ans. পত্তি শ্রীরামালু ছিলেন জনপ্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী তেলেগু নেতা । ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ প্রদেশের তেলেগু ভাষাভাষী অঞ্চলকে পৃথক করে অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের দাবিতে দীর্ঘ ৫৮ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন । তাঁর মৃত্যুর পর সারা অন্ধ্রপ্রদেশ জুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয় । এরপর কেন্দ্রীয় সরকারের তৎপরতায় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আপোস করে পৃথক ভাষাভিত্তিক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয় ।
৩.৪৯ আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার উপাদান রূপে 'সরকারি নথিপত্রে'র সীমাবদ্ধতা কী ?
Ans. আধুনিক ইতিহাসচর্চার উপাদান হিসেবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদন, চিঠিপত্র, অন্যান্য সরকারি নথি প্রভৃতির প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলি হল—[i] এসব নথিপত্রে নানা ঘটনার বিকৃতি থাকতে পারে। [ii] এসব নথিপত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের ভালোদিকগুলো প্রকাশ করা হয় যা প্রকৃত ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ।
৩.৫০ আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথা বলতে কী বোঝায় ?
Ans. [i] লেখক তার নিজের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন তা আত্মজীবনী নামে পরিচিত। আত্মজীবনী থেকে সমকালীন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি বিষয়ে নানা তথ্য পাওয়া যায়। সরলাদেবী চৌধুরানির ‘জীবনের ঝরাপাতা' একটি আত্মজীবনীমূলক রচনা। [ii] লেখক যখন নিজের স্মৃতি থেকে তার অতীত সময়কালে দেখা বা জানা বিভিন্ন ঘটনাবলির বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন তখন তাকে স্মৃতিকথা বলা হয়। দক্ষিণারঞ্জন বসুর লেখা ‘ছেড়ে আসা গ্রাম একটি অন্যতম স্মৃতিকথা।
৩.৫১ এ দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল ?
Ans. ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে [i] ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির অগ্রগতি ঘটানো। [ii] এদেশে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো [iii] ভারতীয়দের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার ঘটানো।
৩.৫২ 'নববিধান' কী ?
Ans. ‘নববিধান' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল ‘নতুন বিধান’ বা ‘নতুন নিয়ম রীতি’ নববিধান হল ব্রাম্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের একটি শাখা| কেশবচন্দ্র সেন ও শিবনাথ শাস্ত্রীর মধ্যে বিরোধ শুরু হলে শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর অনুগত তরুণদের নিয়ে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং কেশবচন্দ্র ১৮৮০ সালে তার অনুগামীদের নিয়ে নববিধান প্রতিষ্ঠা করেন।
৩.৫৩ চুয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮ - ১৭৯৯) গুরুত্ব কী ছিল ?
Ans. বিদ্রোহী চুয়াড় উপজাতি ইংরেজ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৭৮৯-৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহের গুরুত্বগুলি ছিল—[i] বিদ্রোহের পর চুয়াড়দের ওপর পুলিশি দমন-পীড়ন বাড়ে। [ii] চুয়াড়দের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে তাদের জন্য দুর্গম অঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল জেলা গঠন করা হয়৷ [iii] এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী পথ দেখায়। [iv] বিদ্রোহে ইরেজদের বিরুদ্ধে চুয়াড় কৃষক ও জমিদাররা ঐক্যবদ্ধ হয়।
৩.৫৪ ফরাজি আন্দোলন কী নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল ?
Ans. ফরাজি আন্দোলনের প্রকৃতি শুধুই ধর্মীয় ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন যে, এটি নিছকই হিন্দুবিরোধী এবং ধর্মীয় আন্দোলন ছিল| তবে নরহরি কবিরাজ, অভিজিত দত্ত প্রমুখ ধর্মীয় আন্দোলনের পাশাপাশি ফরাজি আন্দোলনে কৃষকশ্রেণির ব্যাপক অংশগ্রহণ, তীব্র ব্রিটিশ-বিরোধিতা প্রভৃতিও লক্ষ করেছেন।
৩.৫৫ 'ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি' কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ?
Ans. ল্যান্ডহোল্ডার্স সোসাইটি প্রতিষ্ঠার (১৮৩৮ খ্রি.) প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল—[i] চিরস্থায়ী ভূমিব্যবস্থার মধ্যে জমিদারদের নিজেদের স্বার্থরক্ষা করা। [ii] খাজনা-মুক্ত ভূমিব্যবস্থা প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগ প্রতিহত করা। [iii] ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটানো।
৩.৫৬ উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে 'আনন্দ মঠ' উপন্যাসটির কীরূপ অবদান ছিল ?
Ans. উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল—[i] উপন্যাসটি যুবসমাজকে শেখায় যে, জন্মভূমি স্বদেশ হল মা। [i] মায়ের মুক্তির উদ্দেশ্যে সন্তানের চুড়ান্ত আত্মত্যাগের প্রয়ােজন। [iii] দেশসেবায় আনন্দমঠের সন্তানদলের আত্মত্যাগ বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করে।
৩.৫৭ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের প্রভাব কতটা ?
Ans. বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে ছাপাখানার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ করা যায়—[i] বাংলায় গণশিক্ষার প্রসার শুরু হয়। [ii] উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সস্তায় বইপত্র শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছোতে থাকে। [iii] সাধারণ মানুষ সুলভে বইপত্র থেকে বিভিন্ন জ্ঞান আহরণের সুযোগ পায়। [iv] বইয়ের ব্যাবসার নতুন বাজার গড়ে ওঠে।
৩.৫৮ উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ ছিল কেন ?
Ans. ঔপনিবেশিক শিক্ষা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, কারণ—
[i] ভারতের চিরাচরিত শিক্ষায় যা কিছু সদর্থক ছিল ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা তা ধ্বংস করে। [ii] ঔপনিবেশিক শিক্ষাকাঠামোয় ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অবহেলা করা হয়। [ii] ইংরেজি ভাষার বাহন এই শিক্ষা ভারতে গণশিক্ষার প্রসারে ব্যর্থ হয়। [iv] এই শিক্ষার মাধ্যমে ইংরেজদের গোলাম করণিক তৈরি এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়।
৩.৫৯ মোপলা বিদ্রোহের (১৯২১) কারণ কী ?
Ans. মোপলা বিদ্রোহের (১৯২১) প্রধান কারণগুলি ছিল—[i] ব্রিটিশ সরকার মোপলার কৃষকদের ওপর তীব্র রাজস্বের বোঝা ও অন্যান্য বেআইনি কর চাপিয়ে দেয়। [ii] জমিতে কৃষকদের অধিকার অস্বীকার করা হয়। [ii] কৃষকদের ওপর জমিদারদের তীব্র অত্যাচার ও শোষণের ফলে তারা ক্ষুব্ধ হয়।
৩.৬০ কী উদ্দেশ্যে কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল প্রতিষ্ঠিত হয় ?
Ans. কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক দল (১৯৩৪ খ্রি.) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যগুলি ছিল—[i] কংগ্রেসে সমাজতান্ত্রিক আদর্শগুলি গ্রহণ করার জন্য বর্ষীয়ান নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। [i] দরিদ্র দেশবাসীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে কাজ করা। [iii] পুঁজিপতি, জমিদার ও দেশীয় রাজাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া [iv] ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে কাজ করা।
৩.৬১ ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দেরর ১৬ই অক্টোবর বাংলার নারী সমাজ কেন অরন্ধন পালন করে ?
Ans. স্বদেশি আন্দোলনের সূচনালগ্নে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহবানে বাংলার নারীরা অরন্ধন পালন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল—[i] বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, [ii] হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি ঐক্যের স্বরূপ তুলে ধরা, [iii] নারীদের অংশগ্রহণে স্বদেশি আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।
৩.৬২ ননীবালা দেবী স্মরণীয় কেন ?
Ans. ননীবালা দেবী ইতিহাসে স্মরণীয়, কারণ—[i] তিনি ছিলেন এক দুঃসাহসী বিপ্লবী। [ii] নিজের বাড়িতে বিপ্লবীদের গোপনে আশ্রয় দিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। [iii] তাকে মাটির নীচে জানালাহীন কক্ষে আটক রাখা হয়। [iv] একদা প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি অবস্থায় পুলিশ সুপার গোল্ডিকে কষিয়ে চড় মারেন। [v] তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম রাজবন্দি।
৩.৬৩ সর্দার প্যাটেলকে 'ভারতের লৌহমানব' বলা হয় কেন ?
Ans. ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেলকে ভারতের লৌহমানব বলা হয়, কারণ—[i] তিনি ছিলেন সর্বদা নীতি ও আদর্শে অটল। [ii] তিনি অনমনীয় দৃঢ়তার সঙ্গে স্বাধীন ভারতে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্যের ভারতভুক্তি ঘটান।
৩.৬৪ কী পরিস্থিতিতে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) গঠিত হয়েছিল ?
Ans. স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের রাজ্য পুনর্গঠনের ভিত্তি নির্ধারণে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়। এই সময় [i] কংগ্রেস ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠনের বিরোধিতা করলে (১৯৪৮ খ্রি.) সারা দেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। [ii] ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তেলুগু গান্ধিবাদী নেতা পত্তি শ্রীরামুলু পৃথক অপ্রদেশ গঠনের দাবিতে অনশন করে মৃত্যুবরণ করলে তেলুগুভাষী জেলাগুলিতে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। [ii] এই অবস্থায় রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়।
👉বিভাগ 'ঘ':
৪। সাত বা আটটি বাক্যে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও । 4x6 =24
৪.১ 'উডের নির্দেশনামা' (১৮৫৪) কে এদেশের শিক্ষা বিস্তারের 'মহাসনদ' বলা হয় কেন ?
Ans. উডের ডেসপ্যাচ:
ভূমিকা: লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রম ও গঠনরীতিতে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। এই পরিস্থিতিতে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা-বিষয়ক একটি নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এটি উডের ডেসপ্যাচ বা উডের নির্দেশনামা নামে পরিচিত।
[i] সুপারিশ: উডের ডেসপ্যাচ-এ যেসব সুপারিশ করা হয় সেগুলি হল— (1) সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে ৫টি শ্রেণিতে বিভাজন, (2) দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা, (3) কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, (4)একটি পৃথক শিক্ষাদপ্তর গঠন, (5) উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ কর্তা হিসেবে ‘ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন' পদ সৃষ্টি, (6) শিক্ষক-শিক্ষণ ব্যবস্থা চালু, (7) সাধারণ শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার, (8) উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি, (9) স্ত্রীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি।
[ii] মহাসনদ: উডের নির্দেশনামা বা ডেসপ্যাচের ওপর ভিত্তি করে ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই জন্য এই নির্দেশনামাকে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা ‘মহাসনদ' বলা হয়। উপসংহার: আধুনিক শিক্ষার বিকাশের ক্ষেত্রে উডের নির্দেশনামা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা এটি ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পাঠক্রম ও পঠনরীতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে সক্ষম হয়েছিল।
৪.২ শ্রীরামকৃষ্ণের 'সর্বধর্ম সমন্বয়' -এর আদর্শ ব্যাখ্যা কর ।
Ans. ঊনবিংশ শতকের ধর্ম ও সমাজজীবনে রামকৃয় পরমহংসদেবের ভূমিকা:
ভূমিকা: উনিশ শতকে যখন বাংলায় হিন্দুধর্ম নানা কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বেড়াজালে আবদ্ধ তখন আধ্যাত্মিক পুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃয় পরমহংসদেব (১৮৩৬-৮৬ খ্রি.) সর্বধর্মসমন্বয় অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রীতির আদর্শ প্রচার করে হিন্দু সম্প্রদায়কে নতুন আশার আলো দেখান।
[i] যত মত, তত পথ: শ্রীরামকৃষের ধর্মীয় আদর্শের মূল কথা ছিল ‘সর্বধর্ম সমন্বয়। তিনি সকল ধর্মের সুসম্পর্কের বা সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শ প্রচার করে বলেন যে, সাধনার সব পথই সত্য ও সঠিক, অর্থাৎ “যত মত, তত পথ'। তিনি বলতেন যে বৈয়ব, শাক্ত, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান প্রভৃতি সব ধর্মের সাধনার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরলাভ করা যায়।
[ii] নিষ্কাম কর্মের আদর্শ : শ্রীরামকৃষ্ণু সাধনার জন্য সংসার ত্যাগের বদলে সংসারের আসক্তিকে জয় করার পরামর্শ দিয়েছেন কৰ্মত্যাগের বদলে তিনি বলেছেন নিষ্কাম কর্মের কথা।
[iii] আন্তরিকতার আদর্শ: শ্রীরামকৃম্ন বলেছেন যে, ঈশ্বরলাভের জন্য শাস্ত্রীয় বিধি, জপতপ, মন্ত্রতন্ত্র, যাগযজ্ঞ কিংবা কৃচ্ছসাধনা—কোনোটারই প্রয়ােজন নেই। শুধুমাত্র আন্তরিকতাকে সম্বল করেই যে-কোনো মানুষ স্বাধীনভাবে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে।
[iv] শিবজ্ঞানে জীবসেবা: শ্রীরামকৃষ্ণু বলতেন যে, জীবের কল্যাণসাধনই হল যথার্থ ধর্ম। তাই জীবে দয়া নয়, তিনি ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবার কথা বলেছেন।
[v] চৈতন্যের পথে যাত্রা: মানুষের মহত্বে বিশ্বাসী শ্রীরামকৃয় মনে করতেন যে, প্রত্যেক মানুষই হল অনন্ত শক্তির আধার এবং চৈতন্যের পথে অগ্রসর হওয়াই হল মানুষের ধর্ম।
[vi] নারীমুক্তি : শ্রীরামকৃয়ের কাছে নারী হল সাক্ষাৎ জগন্মাতার প্রতিমূর্তি। ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নারীমুক্তির আদর্শকে তিনি পূর্ণতার পথে এগিয়ে দেন। নারী জাতির দুর্দশামোচন ও সেকাজে নারীরই নেতৃত্বকে স্বীকৃতি জানিয়ে নারীর মহিমাকে তিনি আরও উঁচুতে তুলে ধরেন। উপসংহার: শ্রীরামকৃষ্মের ধর্মীয় আদর্শের মূল কথা ছিল ‘সর্বধর্মসমন্বয়'। তাই সকল ধর্মের সুসম্পর্কের বা সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শ প্রচার করে তিনি বলতেন যে, “সব। মতকে এক-একটি পথ বলে জানবে আমার ঠিক পথ, আর সকলের মিথ্যা—এরূপ বোধ না হয়। বিদ্বেষভাব না হয়।”
৪.৩ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কীরূপ ছিল ?
Ans. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব:
ভূমিকা: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটে এবং এই শিক্ষা গ্রহণ করে একদল শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রতি এই শ্রেণির মনোভাব সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল—
[i] ব্রিটিশ শাসনের ওপর আস্থা: শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্তদের একটি বড়ো অংশ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের ওপর অগাধ আস্থা রাখত। তারা ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের পক্ষে কল্যাণকর বলে মনে করত এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহেরও বিরোধী ছিল।
[ii] সিপাহিদের সাফল্যে অবিশ্বাস: বিদ্রোহের মাধ্যমে। ইংরেজদের বিতাড়নের পর কেউ ভারতে জাতীয় রাষ্ট্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে কি না এই বিষয়ে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ সন্দিহান ছিল। তাই তারা ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি।
[iii] খ্যাতনামা বাঙালিদের অভিমত: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তার ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় বিদ্রোহীদের নৃশংস, বর্বর এবং নরহত্যাকারী দস্যু বলে অভিহিত করেন। রাজনারায়ণ বসু ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে নৈরাজ্যবাদী' এবং নানা সাহেব, আজিমউল্লার মতো বিদ্রোহী নেতাদের অন্যায়কারী দানব’ বলে অভিহিত করেন। 3 সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন যে, এই বিদ্রোহে জনগণের সমর্থন ছিল না
[iv] বাংলায় বিদ্রোহের দুর্বলতা: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত তীব্র হলেও শিক্ষিত বাঙালি সমাজের সমর্থনের অভাবে এই বিদ্রোহ বাংলায় খুব একটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।
[v] পরিণাম: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা প্রথমদিকে বিদ্রোহকে সমর্থন না করলেও বিদ্রোহ দমনে সরকার যে নিঠুর দমননীতির আশ্রয় নেয় তা শিক্ষিতদের চোখ খুলে দেয়। তারা উপলদ্ধি করে যে, ব্রিটিশ শাসন কখনও ভারতীয়দের কল্যাণ করবে না এই চেতনা পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে। উপসংহার: সব শিক্ষিত বাঙালিই মহাবিদ্রোহের বিরুদ্ধে ছিল এবং ইংরেজদের সমর্থন বা সহযোগিতা করেছিল—এ কথা বলা ভুল হবে। এই যুগে বিদ্যাসাগরের মতো কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র অবশ্যই ছিল।
৪.৪ ভারত সভার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির ভূমিকা বিশ্লেষণ কর ।
Ans. ভারতসভার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সুরেন্দ্রনাথের ভূমিকা:
ভূমিকা: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর নানা কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতসভার প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠেন।
[i] দেশব্যাপী প্রচার: ভারতসভাকে একটি সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেন এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে জনমত গঠনের উদ্যোগ নেন।
[ii] বিভিন্ন শাখা স্থাপন: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয় উদ্যোগ ও প্রচারের ফলে লখনউ, মিরাট, লাহোর, সিন্ধু প্রভৃতি অঞ্চলে শীঘ্রই ভারতসভার বেশ কিছু শাখা স্থাপিত হয়।
[iii] আন্দোলনে নেতৃত্বদান: সুরেন্দ্রনাথ ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ভারতসভাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। (1) তিনি আই সি এস পরীক্ষায় বসার উধর্বতম বয়স ১৯ থেকে বাড়িয়ে ২২ বছর করার দাবি জানান। (2) লর্ড লিটন কর্তৃক প্রবর্তিত ‘দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন’ ও ‘অস্ত্র আইন' (১৮৭৮ খ্রি.)-এর বিরুদ্ধে তিনি। আন্দোলন গড়ে তোলেন (3) তিনি ইলবার্ট বিল-এর সমর্থনে আন্দোলন গড়ে তোলেন। (4) কৃষকদের স্বার্থরক্ষার দাবিতেও তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন।
[iv] সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন: সুরেন্দ্রনাথের সক্রিয় উদ্যোগে কলকাতায় ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন বা অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কনফারেন্স নামে মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়।
[v] কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় প্রেরণা: ড. অমলেশ ত্রিপাঠী ‘সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন’কে ‘জাতীয় কংগ্রেসের মহড়া' বলে অভিহিত করেছেন। কেননা, এই সম্মেলনের প্রেরণায় অ্যালান অক্টেভিয়ান হিউম ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।
[vi] কংগ্রেসকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা: ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন বসলে সুরেন্দ্রনাথ তাঁর অনুগামীদের নিয়ে অধিবেশনে যোগ দেন। এর ফলে কংগ্রেস অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
উপসংহার: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্বে সুরেন্দ্রনাথই প্রথম ভারতবাসীকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পরে কংগ্রেস গড়ে উঠলে তিনি সদলবলে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ভারতীয়দের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। তাঁকে 'রাষ্টগুরু' সম্মানে ভূষিত করা হয়।
৪.৫ বারদৌলি সত্যাগ্রহের প্রতি জাতীয় কংগ্রেসের কীরূপ মনোভাব ছিল ?
Ans. বারদৌলি সত্যাগ্রহের প্রতি জাতীয় কংগ্রেসের মনোভাব:
ভূমিকা: ব্রিটিশ সরকার বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে ভূমিরাজস্বের হার ৩০% বাড়িয়ে দিলে কৃষকদের দুর্দশা বাড়ে। তারা সরকারের কাছে আবেদন করে রাজস্বের হার কমাতে ব্যর্থ হলে আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়।
[i] কংগ্রেসকে প্রস্তাব: গুজরাটের সক্রিয় নেতা নরহরি পারিখ, রবি শঙ্কর ব্যাস, মোহনলাল পাণ্ডে প্রমুখ গ্রামের ক্ষুদ্ধ কৃষকদের সঙ্গে আন্দোলনের পন্থা নিয়ে আলোচনা করেন এবং তাতে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
[ii] প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনা: গান্ধিবাদী কংগ্রেস নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ইতিপূর্বে গুজরাটের খেদা সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব দিয়ে খ্যাতিলাভ করেন। গুজরাটের নেতৃবৃন্দ প্যাটেলের সঙ্গে দেখা করে তাদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
[iii] প্যাটেলের পরামর্শ: প্যাটেল কৃষকদের বলেন যে, তিনি ঐক্যবদ্ধ কৃষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে রাজি আছেন। কিন্তু খাজনা প্রদান বন্ধ করলে কৃষকদের জেল, জমি থেকে উৎখাত প্রভৃতি ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা জানান যে, তারা যে-কোনো ঘটনার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
[iv] গান্ধিজির সম্মতি; এরপর প্যাটেল বারদৌলির আন্দোলনকারীদের মনোভাবটি গান্ধিজিকে জানান। গান্ধিজি প্যাটেলের উদ্যোগে সম্মতি জানান। তবে গান্ধিজি জানান যে, তিনি নিজে বা কংগ্রেস প্রত্যক্ষভাবে বারদৌলির এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবে না।
উপসংহার: প্যাটেলের নেতৃত্বে বারদৌলি সত্যাগ্রহ তীব্র আকার ধারণা করে। এতে নেতৃত্ব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতা হিসেবে প্যাটেলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
৪.৬ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা কীরূপ ছিল ?
Ans. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন পর্বে বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রগতি:
ভূমিকা: ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন শুরু হলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শ্রমিকরাও এই আন্দোলনে শামিল হয়। তবে এই সময় বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের সর্বাধিক প্রসার ঘটে।
[i] মিছিল ও জমায়েত: লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভঙা কার্যকর করলে। বাংলার বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিক ও মজুররা প্রতিবাদ মিছিল ও জমায়েতে যোগ দেয়।
[ii] বয়কট: বাংলার বিভিন্ন জেলার শ্রমিক ও মজুররা বিলাতি পণ্য বয়কট করে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। ময়মনসিংহের মুচিরা বিদেশি জুতা সারাতে, বরিশালের উড়িয়া রাঁধুনিরা রান্নায় বিদেশি দ্রব্য ব্যবহার করতে, কালীঘাটের ধোপারা বিলাতি কাপড় কাচতে আপত্তি জানায়।
[iii] রেল ধর্মঘট: বাংলার বিভিন্ন স্থানে রেল শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কর্মচারীরা ব্যাপক ধর্মঘট শুরু করে এবং রেলওয়ে মেন্স ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে। জামালপুর, খড়গপুর, আসানসোল প্রভৃতি স্থানের রেল ওয়ার্কশপ-এর কর্মচারীরাও ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে।
[iv] চটকলে ধর্মঘট: কলকাতার সন্নিহিত বাউড়িয়া জুটমিল,বজবজে ক্লাইভ জুটমিল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের চটকল শ্রমিকরাও ধর্মঘট করে।
[v] অন্যান্য ধর্মঘট: এ ছাড়া কলকাতার ট্রাম কোম্পানি,ছাপাখানা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। বরিশাল সেটেলমেন্ট, হাওড়ার বার্ন কোম্পানি প্রভৃতির শ্রমিকরাও ধর্মঘট করে।
[vi] কুলি ও মেথরদের ধর্মঘট: কলকাতা পুরসভার ২ হাজার কুলি এবং মেথরও ধর্মঘটে শামিল হয়। এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের সমর্থনে কলকাতায় মিছিল বের হয়।
[vii] আন্দোলনের অবসান: আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক পুলিশি নির্যাতন শুরু হলে বাংলার শ্রমিক আন্দোলন দিশাহারা হয়ে পড়ে। তা ছাড়া ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে গগ আন্দোলন ক্ৰমে দুর্বল হতে শুরু করলে শ্রমিক আন্দোলনও গতি হারিয়ে ফেলে।
উপসংহার: বাংলার বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপকতায় সরকার চিন্তিত হয়ে পড়ে। অবশ্য ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমননীতি এবং ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সরকার কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার ফলে বাংলার শ্রমিক আন্দোলন তার গতি হারায়।
৪.৭ জুনাগড় রাজ্যটি কী ভাবে ভারতভুক্ত হয় ?
Ans. জুনাগড়ের ভারতভুক্তি:
ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ভারতীয় ভূখন্ডের অধিকাংশ দেশীয়
রাজ্য ভারতে যোগদান করলেও কয়েকটি রাজ্য ভারতে যোগ দিতে অস্বীকার করে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল কাথিয়াবাড় উপদ্বীপে অবস্থিত জুনাগড়।
[i] সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি : দেশীয় রাজ্য জুনাগড়ের জনসংখ্যার অন্তত ৮০ শতাংশই ছিল হিন্দু। কিন্তু সেখানকার মুসলিম নবাব জুনাগড়কে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন জুনাগড়ের দেওয়ান শাহনওয়াজ ভুট্টো-ও ছিলেন মুসলিম লিগের উগ্র সমর্থক।
[ii] প্ৰজাবিদ্রোহ : জুনাগড়ের নবাব রাজ্যটিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইলে সেখানকার অ-মুসলিম প্রজাদের মধ্যে প্রবল গণবিক্ষোভ ও ব্যাপক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
[iii] সেনা অভিযান : জুনাগড়ে তীব্র প্রজাবিদ্রোহের ফলে সেখানকার নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সেনাবাহিনী জুনাগড়ে প্রবেশ করে।
[iv] গণভোট: জুনাগড়ের বাসিন্দারা ভারত, না পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে আগ্রহী তা জানার জন্য সেখানে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে গণভোট নেওয়া হয়। গণভোটে সেখানকার মানুষ ভারতে যোগদানের পক্ষে মত দেয়।
[v] ভারতে যোগদান: গণভোটের পর জুনাগড় ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে (জানুয়ারি) ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। উপসংহার: জুনাগড়ের ভারতে অন্তর্ভুক্তির ফলে দেশীয় রাজ্য দখলে এনে পাকিস্তানের শক্তিবৃদ্ধির প্রয়াস ধাক্কা খায়। এতে ভারতের সুবিধা হয়।
৪.৮ উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে ভারত সরকার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করে ?
Ans. উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ:
ভূমিকা: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ববঙ্গ) থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম-সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় নেয়। স্বাধীন ভারত সরকারকে বাধ্য হয়ে উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে নানা উদ্যোগ নিতে হয়।
[i] উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দান: ভারতে আগত নিঃস্ব, রিক্ত উদ্বাস্তুরা অনেকেই প্রথমে বিভিন্ন রেলস্টেশন, ফুটপাত, পরিত্যক্ত ঘরবাড়িতে বা খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নেয়। সরকার বিভিন্ন স্থানে উদ্বাস্তু শিবির প্রতিষ্ঠা করে আপাতত সেখানে উদ্বাস্তুদের বসবাসের ব্যবস্থা করে।
[ii] ত্রাণশিবিরের ব্যবস্থা: শিবিরগুলিতে বসবাসের সময় সরকার উদ্বাস্তুদের খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, পানীয় জল, আলো, কিছু নগদ অর্থ, ওষুধপত্র প্রভৃতি সরবরাহ করে। উদ্বাস্তু পরিবারগুলির বালক-বালিকাদের জন্য শিক্ষাদানেরও ব্যবস্থা করা হয়।
[iii] পুনর্বাসনের ব্যবস্থা: শিবির থেকে উদ্বাস্তু পরিবারগুলিকে বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। সেময় উদ্বাস্তুদের বাড়ি তৈরি, জীবিকানির্বাহ প্রভৃতির জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
[iv] পাঞ্জাবে গৃহীত ত্রাণব্যবস্থা: পাঞ্জাবে আশ্রয়গ্রহণকারী উদ্বাস্তুদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেয়। বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন উপনগরী গড়ে তুলে সেখানে তাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়।
[v] পশ্চিমবঙ্গে গৃহীত ত্রাণব্যবস্থা: পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয়গ্রহণকারী উদ্বাস্তুরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের সহযোগিতা পায়নি বলে অনেকে সমালোচনা করেন। তা ছাড়া বহু বাঙালি উদ্বাস্তুকে মধপ্রদেশ-উড়িষ্যা সংলগ্ন দণ্ডকারণ্য, আন্দামান প্রভৃতি দূরবর্তী স্থানে পুনর্বাসনে পাঠালে তারা বাংলার পরিবেশ ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উপসংহার: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পাঞ্জাব প্রদেশে সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু আশ্রয় নেয়। অভিযোগ ওঠে যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পাঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে যতটা যত্নবান ছিলেন, ততটা যত্নবান বাঙালি উদ্বাস্তুদের বিষয়ে ছিলেন না।
৪.৯ 'নীলদর্পণ' নাটক থেকে উনিশ শতকের বাংলার সমাজের কীরূপ প্রতিফলন পাওয়া যায় ?
Ans. ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দীনবন্ধু মিত্রের নাটক 'নীল দর্পণ' -এ সে সময়ের নীলচাষ এবং নীলকরদের অত্যাচারে বাংলার সমাজ জীবনে যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তার মর্মান্তিক ছবি ফুটে উঠেছ । অষ্টাদশ শতকের শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পে নীলের চাহিদা প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পেলে মুনাফালোভী ইংরেজরা দাদনের জালে আবদ্ধ করে ছলে, বলে, কৌশলে দিল্লি থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করে, অন্যথায় চলে অকথ্য অত্যাচার, গৃহে আগুন, লুটপাট, শারীরিক নির্যাতন, চাবুক-শ্যামাচাঁদের ব্যবহার, স্ত্রী-কন্যার অপহরণ, লাঞ্ছনা, পুলিশি নির্যাতন, খাদ্যাভাব —যার প্রতিবাদে ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় নীলবিদ্রোহ ।
নীলবিদ্রোহ ছিল কৃষকদের মানসিক দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত, সম্পূর্ণ ধর্ম নিরপেক্ষ ঐকবদ্ধ সংগ্রাম যা এ নাটকে সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে । অসহায়, অত্যাচারিত কৃষকদের দুঃখদুর্দশা, নীলকরদের অত্যাচার, জমিদারদের এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সামাজিক মানসিকতা, পারস্পরিক কর্তব্যবোধ, পিতৃভক্তি, অপত্যস্নেহ, সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক মেলবন্ধন সবই প্রতিফলিত হয়েছে 'নীলদর্পণ' নাটকে ।
অক্ষয়কুমার দত্তের 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা', হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকা, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' প্রভৃতি পত্রিকায় কৃষকদের প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল । এছাড়াও শিশিরকুমার ঘোষ, হরিনাথ মজুমদার, মাথুরানাথ মৈত্র সোচ্চার হলেও সাহিত্যে প্রতিবাদের চরম প্রকাশ ঘটেছিল দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকে, যার ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও প্রকাশ করেছিলেন নিজ নামে রেভারেন্ড জেমস লঙ । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'নীলদর্পণ' কে হ্যারিয়েট বিচার স্টো-র নাটক 'আংকেল টমস কেবিন' -এর সঙ্গে তুলনা করেছেন । নীলকরদের অকথ্য অত্যাচার ও নদীয়ার গুয়াতলির মিত্র পরিবারের বিপর্যয়ের কাহিনীকে ভিত্তি করে লেখা এই নাটকে তৎকালীন সমাজজীবনের অবস্থা, অনুভূতি, শাসন-শোষণ সংগ্রাম ও সম্প্রীতির চিত্র সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ।
৪.১০. উনিশ শতকে নারীশিক্ষা বিস্তারে ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন ?
Ans. উনিশ শতকের শুরুর দিকে মেরি অ্যান কুবা, রাধাকান্ত দেব প্রমুখের উদ্যোগে নারীশিক্ষার সূচনা হলেও ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে বড়লাটের শাসন পরিষদের আইনসদস্য ও বাংলার শিক্ষা কাউন্সিলের সভাপতি ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন কর্তৃক 'হিন্দু ফিমেল স্কুল' বা 'নেটিভ ফিমেল স্কুল' প্রতিষ্ঠা এই উপমহাদেশে নারীশিক্ষায় নতুন যুগের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল । বেথুন সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বিটন । বেথুন সাহেবের স্মৃতিতে পরে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হয় 'বেথুন স্কুল' এবং ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এটি মহাবিদ্যালয় বা কলেজের মর্যাদা লাভ করে । বেথুন সাহেব নিজেই রাধাকান্ত দেবের 'স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক' নামক বইটির সংস্করণ প্রকাশ ও প্রচার করেন । বেথুন কলেজ হল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কলেজ ।
বহুভাষাবিদ, ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত এবং আইনজ্ঞ বেথুন সাহেব অনুভব করেছিলেন এদেশে নারীদের সামগ্রিক উন্নতির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আধুনিক শিক্ষা এবং উন্নত মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । তাঁকে এ কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, রামগোপাল ঘোষের মতো অগ্রগণ্য ব্যক্তিরা । বেথুন সাহেব তার মাসিক আয়ের অধিকাংশ এবং বিষয় আশয় এই বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় ও দান করে যান । মেয়েদের ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি সূচিশিল্প, এমব্রয়ডারি, অঙ্কনবিদ্যায় পারদর্শিনী করে তোলাই ছিল বেথুন সাহেবের উদ্দেশ্য । তিনি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন । বেথুন সাহেব ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি ও কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি গঠনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন । বঙ্গভাষানুবাদ সমাজ গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ।
৪.১১ হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল ?
Ans. উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নব্যহিন্দুবাদ এবং বাংলা তথা ভারতে সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনার জাগরণ ঘটানো এবং জাতীয় গৌরববৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ শাসনকালে গঠিত সংগঠনগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল 'হিন্দুমেলা' । নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসুর সহযোগিতায় ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে চৈত্র সংক্রান্তির দিন 'হিন্দুমেলা' প্রতিষ্ঠা করেন । তাই এটি 'চৈত্রমেলা' নামেও পরিচিত ছিল । এর প্রথম সম্পাদক হন জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর । 'হিন্দুমেলা' প্রতিষ্ঠার পিছনে উদ্যোক্তাদের বেশ কিছু আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল যা হল—
♦ সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে হিন্দুধর্মের অতীত গৌরবগাথা ছড়িয়ে দেওয়া ।
♦ দেশীয় ভাষাচর্চা করা ও জাতীয় প্রতীকগুলিকে মর্যাদা দেওয়া ।
♦ প্রাচীন হিন্দুধর্মের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করা ।
♦ গোপনে হিন্দু যুবকদের মধ্যে বৈপ্লবিক ভাবধারা জাগিয়ে তোলা ।
♦ হিন্দু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আত্মনির্ভর ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা করা ।
হিন্দুমেলা শরীরচর্চা, অশ্বচালনা প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত ও স্বাস্থ্য প্রভৃতির উন্নতি ঘটিয়ে আত্মনির্ভরতা ও ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে যুবসমাজকে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল । তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে প্রবেশ না করে 'হিন্দুমেলা' শুধু দেশাত্মবোধ প্রচারের উদ্যোগ নেয় । সর্বোপরি দেশি জিনিসের প্রদর্শনী, জাতীয় সংগীত, বক্তৃতাদি সহ দেশীয় ভাষা মূলত বাংলা ভাষার উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে হিন্দুমেলার সদস্যরা সচেষ্ট ছিলেন, যেমন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের রচিত গান, কবিতা পরিবেশন করেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর কবিতা 'হিন্দুমেলার উপহার' পাঠ করেন । 'হিন্দুমেলা' দেশীয় বিদ্যাশিক্ষার উন্নতি ও প্রসারে নিয়োজিত স্বদেশীদের সম্মান জানান এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলিকে জনসমক্ষে প্রচারের জন্য 'ন্যাশনাল পেপার' নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন ।
৪.১২ 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা' -কে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন ?
Ans. ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেশন অ্যাক্ট প্রবর্তন করে ব্রিটিশ শাসক বাংলার জমিদারদের অধিকৃত জমি পুনঃগ্রহণের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে টাকির জমিদার কালিনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে গড়ে ওঠে 'বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা' । এই সভার সভাপতিত্ব করেন গৌরীশংকর তর্কবাগীশ এবং সম্পাদক হয়েছিলেন পণ্ডিত দুর্গাপ্রসাদ তর্কপঞ্চানন । এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতবাসীর মঙ্গল-অমঙ্গলকারী বিষয়গুলির আলোচনা ও পর্যালোচনা করা, যেমন— কোম্পানি কর্তৃক নিষ্করভূমির ওপর কর নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে জনগণের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে সরকারের ত্রুটিগুলি সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায় ।
বেন্টিঙ্কের পাশ্চাত্য ভাষানীতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য প্রসারের জন্য এই সভার উদ্ভব হলেও সভার আলোচনা ও বিতর্কে স্বদেশ ভাবনা বা রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় । ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা এই সভায় নিষিদ্ধ ছিল । ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত 'সংবাদ প্রভাকর' -এ লিখেছিলেন -'রাজকীয় বিষয়ের বিবেচনার জন্য অপর যে সভা হইয়াছিল, তন্মধ্যে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে প্রথম বলিতে হইবেক' এবং গবেষক যোগেশচন্দ্র বাগল এটিকে 'বাঙালি তথা ভারতবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান' বলেছেন । এটি বেশিদিন স্থায়ী না হলেও ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সংগঠন 'জমিদার সভা' -র অগ্রদূত ছিল । তাই বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের প্রথম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানরূপে চিহ্নিত করা হয় ।
৪.১৩ ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষাবিস্তারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ কর ।
Ans. চলমান হরফের প্রচলন ও মুদ্রণ বিপ্লব সারা বিশ্বের জ্ঞানচর্চাকে উচ্চশ্রেণীর সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রসারিত করেছিল । ভারত তথা বাংলায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সর্বোপরি গণশিক্ষার প্রসারে ছাপাখানা ও ছাপাবই -এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । রেভারেন্ড জেমস লঙ -এর মতে, মুদ্রণ ও শিক্ষার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত । শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে মুদ্রিত পুস্তকের একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে । ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার পূর্বে শিক্ষাদান উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার পর প্রচুর ছাপাবই বাজারে আসে । ছাপাবইপত্র দামে সস্তা হওয়ায় সেগুলি সাধারণ মানুষের হাতে সহজে পৌঁছে যায় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়, ফলে দেশে ব্যাপক শিক্ষা বিস্তার শুরু হয় ।
উইলিয়াম কেরি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশন ছাপাখানা স্থাপন করলে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে । ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত বইগুলি জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে, যেমন শ্রীরামপুর মিশন ছাপাখানার উদ্যোগে বাংলায় প্রচুর স্কুলপাঠ্য বই কম দামে পৌঁছায় । কম খরচে বা বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গড়ে ওঠে বহু বিদ্যালয় । সচিত্র পুস্তক মানচিত্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভে আগ্রহী করে তোলে । ছাপাখানা শিশুশিক্ষার অগ্রগতি ও প্রসার ঘটায়, প্রকাশিত হয় মদনমোহন তর্কালঙ্কারের 'শিশুশিক্ষা', বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়', রামসুন্দর বসাকের 'বাল্যশিক্ষা' । বাংলার ছাপাখানায় প্রকাশিত হয় পঞ্জিকা, আইন, ধর্ম, নীতিকথা, ইতিহাস, কৃষিকাজ, সংগীত, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ের বই যার ফলে উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে যেতে থাকে শিক্ষার্থীদের সামনে, তারা উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ লাভ করে এবং ছাপা হয় আঞ্চলিক ও অনুবাদ সাহিত্য । বাংলায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা মুদ্রণশিল্পের ব্যবসায়িক বাজার গড়ে তোলে এবং ছাপাখানার কাজে বই ছাপার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে ছবি, মানচিত্র, নকশা ইত্যাদিতে গুরুত্ব পায় ও পেশাদারিত্বের সূচনা ঘটায় যা বাণিজ্যিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটায় ।
৪.১৪ বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার বিকাশে ড.মহেন্দ্রলাল সরকারের কীরূপ অবদান ছিল ?
Ans. কায়েমী স্বার্থরক্ষাকারী ও প্রভূত্ববাদী ঔপনিবেশিক বিজ্ঞানচর্চার প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা সম্প্রসারণ এবং জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় এম. ডি. ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার । ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার অ্যালোপ্যাথির ডাক্তার হলেও অচিরেই হোমিওপ্যাথির একজন অগ্রগণ্য ডাক্তার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন । তিনি কেশবচন্দ্র সেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রমূখ ব্যক্তিবর্গের চিকিৎসাও করেছিলেন । তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল, ফাদার লাঁফো, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ ব্যক্তির সহযোগিতায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বৌবাজার স্ট্রীটে প্রথম ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স (IACS) প্রতিষ্ঠা করেন । এর পরে এখানে আধুনিক লেকচার থিয়েটার হল এবং বিশ্বমানের ল্যাবরেটরি গড়ে তোলা হয়েছিল ।
IACS তে পদার্থবিদ্যায় ফাদার লাঁফো, ডঃ সরকার স্বয়ং এবং পরে জগদীশচন্দ্র বোস, রসায়নে কানাইলাল দে, গণিতে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ভূতত্ত্বে প্রমথনাথ বসু, জীববিজ্ঞানে নীলরতন সরকার এর মত দিকপাল পণ্ডিতেরা শিক্ষাদানে নিযুক্ত ছিলেন । সি.ভি. রমন এখানে গবেষণা করেন এবং তাঁর বিখ্যাত রমন ক্রিয়া -র জন্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার পান । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে কে. এস. কৃষ্ণন 'Crystal Magnetism' -এর ওপর গবেষণা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন ।
৪.১৫ ভারত সরকার কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার প্রশ্নটি সমাধান করেছিল ?
Ans. স্বাধীনতার প্রাককালে ভারতীয় উপমহাদেশে পাঁচ শতাধিকের বেশি দেশীয় রাজ্যের আওতায় থাকা ভূখণ্ডের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ । তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেল স্বাভাবিকভাবে ভারতের অখন্ডতা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন ।
সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে রাজ্যদপ্তর (State Department) গঠন করেন, তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব ডি.পি.মেনন । সর্দার প্যাটেল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন দেশীয় রাজ্যগুলি যেন তাদের বৈদেশিক কার্যকলাপ, প্রতিরক্ষা ক্ষমতা ও পরিবহন দায়িত্ব ভারতের হাতে তুলে দেয় । তিনি ৫ই আগস্টের মধ্যে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারত ইউনিয়নে যুক্ত হতে অনুরোধ করেন ।
বলাবাহুল্য ভারত স্বাধীন হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় সহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশীয় রাজ্য ব্যতিরেকে প্রায় সমস্ত দেশীয় রাজ্য ভাতা, খেতাব ও অন্যান্য সুযোগসুবিধার বিনিময়ে 'Instrument & Accession' নামে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করে । অবশেষে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে কাশ্মীর, জুনাগড়, হায়দ্রাবাদের মত দেশীয় রাজ্য পর্তুগিজ ও ফরাসি অধিকৃত অঞ্চলগুলি ভারতভুক্ত হয়েছিল ।
৪.১৬ কীভাবে কাশ্মীর সমস্যার সৃষ্টি হয় ?
Ans. ভারতীয় উপমহাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে কাশ্মীরের দক্ষিনে ভারত, পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তর ও উত্তরপূর্বে তিব্বত ও চীনা তুর্কিস্তান । আন্তর্জাতিক ভাবে কাশ্মীরের ভৌগলিক অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ । স্বাধীনতা লগ্ন থেকেই ভারত ও পাকিস্তান এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তিক্ত সম্পর্কের মূলেও কাশ্মীর । ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির সময় কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং, অন্যদিকে কাশ্মীরের রাজতন্ত্র বিরোধী ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ছিলেন শেখ আবদুল্লা । ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের সময়কালে হরি সিং ভারত ও পাকিস্তান কোনদিকে যোগ না দিয়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে কাশ্মীরকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন । কাশ্মীরকে আন্তর্জাতিক ও ভৌগলিক গুরুত্বের কথা ভেবে স্বাধীনতা লাভের পরপরই পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ২২শে অক্টোবর গুলমার্গ প্ল্যান অনুযায়ী কাশ্মীর আক্রমণ করে শ্রীনগরের অনতিদূরে পৌঁছে যায় । এমতাবস্থায় রাজা হরি সিং ভীত হয়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে অক্টোবর ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন ।
ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষরের পরদিনই, ২৭শে অক্টোবর ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে অবতরণ করে এবং পাকিস্তানী হানাদারদের হটিয়ে কাশ্মীরের ২/৩ অংশ দখল করে, মুক্ত অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে একটি আপাৎকালীন সরকার গঠিত হয় । বাকি ১/৩ অংশ আজাদ কাশ্মীর নামে পাকিস্তানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থেকে যায় । এরপর ও পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীরকে ঘাঁটি করে প্রতিনিয়ত ভারতকে বিব্রত করতে থাকে । পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্তি পেতে ভারত ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে নিরাপত্তা পরিষদে আবেদন করে । নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি ঘটে ও যুদ্ধবিরতির সীমারেখাও ঠিক হয় । এতকিছু সত্ত্বেও পাকিস্তান আজও কাশ্মীরকে নিয়ে ভারতকে বিব্রত করে চলেছে ।
৪.১৭ 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' গ্রন্থে উনিশ শতকের বাংলার কীরূপ সমাজচিত্র পাওয়া যায় ?
Ans. ঊনিশ শতকের কলকাতা, কলকাতা তথা বাংলার তৎকালীন সমাজ এবং বাঙালিয়ানা —এই তিনটি বিষয় কালীপ্রসন্ন সিংহ রচিত 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' -য় ব্যঙ্গাত্মক ও তির্যক ভঙ্গিমায় ফুটে উঠেছে ।
♦ 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' গ্রন্থটির প্রথম ভাগ ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে ও দ্বিতীয় ভাগ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এবং সর্বোপরি ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয় ।
♦ গ্রন্থটির একদিকে চড়কপার্বণ, রথযাত্রা, দুর্গাপূজা, বারোয়ারি পূজা-পার্বণ যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি আবার কলকাতার বাবু সমাজের ভণ্ডামি বেপরোয়া জীবনের অন্ধকার দিক, ক্রিশ্চানি হুজুগ, মিউটিনি, লঙ সাহেব, লখনউ -এর বাদশাহ -এর কথাও এতে উঠে এসেছে ।
♦ কালীপ্রসন্ন সিংহ একদিকে ইংরেজি জানা নব্য বাবু ও অন্যদিকে গোঁড়া হিন্দু সমাজ উভয়ের জীবনের স্ববিরোধীতাকে তুলে ধরেছিলেন । কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা প্রগতিশীলতা অপেক্ষা ধর্মীয় গোঁড়ামিকে অধিকমাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছিলেন । তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তৎকালীন সমাজকে বিশ্লেষণ করেন এবং বাবু সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজকে সচেতন করতে তাঁর সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।
♦ কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর 'হুতুম প্যাঁচার নকশা' -য় সমসাময়িক সমাজ ও কলকাতার ভোগবাদী নাগরিক জীবনের তীব্র সমালোচনা করলেও শালীনতার গণ্ডী কখনোই অতিক্রম করেনি । লেখকের রসবোধ, সাহিত্যগুণ এবং সমাজ সচেতনতাবোধ 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' -কে কালোর্ত্তীর্ণ করেছে । 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' -কে উনিশ শতকের ইতিহাসে তৎকালীন সমাজচিত্রের একটি জীবন্ত দলিল বলা যায় ।
৪.১৮ এদেশের চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে কলিকাতা মেডিকেল কলেজের কীরূপ ভূমিকা ছিল ?
Ans. ভারতের সনাতনী চিকিৎসাবিদ্যার বিপ্রতীপে আধুনিক ও পাশ্চাত্য অভিমুখী চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার জন্যও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলেন স্বয়ং বেন্টিঙ্ক সাহেব এবং ভূমি দান করেন মতিলাল শীল ।
♦ কলকাতা মেডিকেল কলেজ হল এশিয়ার দ্বিতীয় কলেজ যেখানে আধুনিক ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যা শেখানো হত । কলকাতা মেডিকেল কলেজে আধুনিক শল্য চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা ও রূপায়নে উদ্যোগী হন এর প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট এম. জে. ব্রামলি ।
♦ কলকাতা মেডিকেল কলেজে শব ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রের জয়যাত্রার সূচনা করেছিলেন মধুসূদন গুপ্ত ও তাঁর সহযোগীরা ।
♦ কলকাতা মেডিকেল কলেজের দ্বার সকল বর্ণের ছাত্রদের জন্য এমনকি মেয়েদের জন্যও উন্মুক্ত ছিল । কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ছিলেন প্রথম মহিলা চিকিৎসক এবং পরবর্তীকালে ভার্জিনিয়া মেরী মিত্র ও বিধুমুখী বসু এখান থেকেই যোগ্যতার সঙ্গে চিকিৎসাবিদ্যায় উত্তীর্ণ হন । কলকাতা মেডিকেল কলেজ বাংলা তথা ভারতের চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা করে ।
প্রাণপুরুষ উয়িলিয়াম কেরি -র দু'বছর আগে থেকেই কাঠের মুদ্রণ যন্ত্র ও দেশীয় ভাষায় অর্থাৎ বাংলা হরফ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং ১৮০০ থেকে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সম্ভবত শ্রীরামপুর মিশন প্রেস লোহার মুদ্রণ যন্ত্রও নিয়ে আসে ।
♦ মিশনারি জশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ড এবং চার্লস গ্রান্ট প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে কেরি সাহেব বই ছাপার উদ্যোগ নেন এবং বই ছাপার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ভূমিকা নেন 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' ।
♦ শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রথম ছাপা বই ছিল বাইবেলের অনুবাদ 'মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত' । প্রথম দিকে মিশন মূলত ধর্মীয় বই অনুবাদ করত এবং এখান থেকে ছাত্রদের জন্য অসংখ্য পাঠ্যপুস্তক, পত্রপত্রিকা যেমন— মাসিক পত্রিকা 'দিগদর্শন', সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সমাচার দর্পণ' প্রভৃতি ছাড়াও অন্যান্য গ্রন্থ যেমন— মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের 'বত্রিশ সিংহাসন', 'রাজাবলি', 'প্রবোধচন্দ্রিকা', রামরাম বসু রচিত 'লিপিমালা', 'জ্ঞানোদয়' হরপ্রসাদ রায়ের 'পুরুষ পরীক্ষা', কেরির 'বাংলা ব্যাকরণ', 'ইঙ্গবঙ্গ অভিযান' প্রভৃতি প্রকাশিত হয় ।
♦ প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও কিছুটা পরে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি -র সঙ্গে সহযোগী হিসাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনায় শ্রীরামপুর মিশন উদ্যোগী হয়েছিল । একটিমাত্র কাঠের মুদ্রণযন্ত্রকে সম্বল করে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস তার যাত্রা শুরু করলেও ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রণযন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৮টিতে । ১৮০১ খ্রিঃ থেকে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শ্রীরামপুর থেকে চল্লিশটি ভাষায় দু-লক্ষ বারো হাজার বই প্রকাশিত হয়েছিল ।
৪.১৯ কী উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক সরকার অরণ্য আইন প্রণয়ন করেন ?
Ans. প্রথমে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ইংরেজ সরকার যে দুটি অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা করা ও আধিপত্য স্থাপন করা ।
♦ ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ এবং ভারতে রেলপথ বিস্তারের লক্ষ্যে কাঠের স্লিপার তৈরির জন্য ভারতে বনজ সম্পদের ওপর ঔপনিবেশিক সরকারের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল ।
♦ ভারতের সুবিস্তৃত বনাঞ্চলের জমিকে পরিষ্কার করে কৃষিযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্য যেমন ছিল তেমনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঝুম চাষের পরিবর্তে স্থায়ী কৃষিকাজে অভ্যস্ত করে তোলার তাগিদ ছিল ।
♦ ব্রিটিশ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমির সম্প্রসারণ ঘটিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং বনজ সম্পদকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করে আয় ও মুনাফা বৃদ্ধি করা ।
♦ এটাও ঠিক যে ব্রিটিশ সরকার ভারতের বনভূমিকে সংরক্ষিত অরণ্য, সুরক্ষিত অরণ্য এবং গ্রামীণ (অশ্রেণিভুক্ত) অরণ্য এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করে বন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল । তবে ঔপনিবেশিক স্বার্থ ও মুনাফা বজায় রাখতে গিয়ে অরণ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার, জীবন ও জীবিকার মূলে কুঠারাঘাত করেছিল এবং যার ফলে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ ।
৪.২০ ১৮৫৭ -এর মহাবিদ্রোহকে কি সামন্ত-শ্রেণির বিদ্রোহ বলা যায় ?
Ans. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় থেকেই এই বিদ্রোহের চরিত্র বা প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন ধারার ইতিহাসচর্চার নানা ধরনের গবেষণালব্দ মতামত পাওয়া যায় ।
♦ ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন তাঁর 'Eighteen Fifty Seven' গ্রন্থে এবং ডঃ শশীভূষণ চৌধুরী তাঁর ' Civil Rebellion in the Indian Mutinies, 1857-59' গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে সামন্ত শ্রেণির বিদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন । তাঁদের মতে ইংরেজ শাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সামন্ত প্রভুদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল এবং তাদের ক্ষমতা খর্ব করেছিল । তাদের হাতেই ছিল বিদ্রোহের নেতৃত্ব । দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সামনে রেখে তারা পুরাতন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনঃপ্রবর্তন করতে চেয়েছিল । ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে ১৮৫৭ -এর বিদ্রোহ ছিল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাততন্ত্র ও মৃতপ্রায় সামন্তশ্রেণির 'মৃত্যুকালীন আর্তনাদ' ।
♦ অধ্যাপক সুশোভন সরকার উপরোক্ত বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন । তাঁর মতে —নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, হজরৎমহল, কুনওয়ার সিং প্রমুখরা সামন্ত জমিদার ও তালুকদার হলেও তারা ছিলেন বিদ্রোহের স্বাভাবিক নেতা । ডঃ সরকার এই বিদ্রোহকে অনেকাংশে জাতীয় বিদ্রোহ হিসাবে দেখার পক্ষপাতী ।
♦ আমরা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে যেমন সামন্তশ্রেণির নেতৃত্বদানের বিষয়টিকে অস্বীকার করতে পারি না তেমনি সৈনিক, কৃষক, কারিগর সহ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ও ভাবাবেগকেও অগ্রাহ্য করতে পারি না । প্রকৃতপক্ষে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নানা সুরে বাঁধা ছিল, যেখানে নানা ধরনের প্রতিরোধ নানারূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল ।
৪.২১ বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের কীরূপ অবদান ছিল ?
Ans. বর্ধমানের বহড়া গ্রামের নিবাসী গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম বাঙালি মুদ্রণ ব্যবসায়ী, পুস্তক ব্যবসায়ী, প্রকাশক ও গ্রন্থকার । কাজের খোঁজে তিনি শ্রীরামপুর মিশনারিদের সংস্পর্শে আসেন । শ্রীরামপুর মিশনেই গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের মুদ্রণ শিল্প এবং প্রকাশনার কাজে হাতেখড়ি হয় । শ্রীরামপুর মিশনের ছাপাখানার কম্পোজিটর, ফেরিস কোম্পানির ছাপাখানায় মুদ্রাকর হিসাবে এবং এরপর উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের গোড়ায় কলকাতায় এসে ব্যবসায়িক লক্ষ্যে ছাপাখানা খোলেন ও বই বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন এবং পরিশেষে কলকাতা থেকে প্রেস নিয়ে নিজের গ্রাম বহড়ায় চলে আসেন । তাঁর প্রেসের নাম ছিল 'বাঙলা গেজেটি যন্ত্রালয়' । এখান থেকেই তিনি সাপ্তাহিক 'বাঙলা গেজেটি' পত্রিকা প্রকাশ করতেন । তাঁর প্রেস থেকে তাঁর সম্পাদিত ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল' সহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছিল । প্রথম সচিত্র বাংলা গ্রন্থ 'অন্নদামঙ্গল' প্রকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং তাঁর এই প্রেস থেকেই ছাপা হয় 'এ গ্রামার ইন ইংলিশ এণ্ড বেঙ্গলি', 'গণিত নামতা', 'ব্যাকরণ লিখবার আদর্শ', 'হিতোপদেশ', 'দায়ভাগ', 'চিকিৎসার্ণব' ইত্যাদি অন্যান্য গ্রন্থ ।
৪.২২ শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কিভাবে একটি অগ্রনী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল ?
Ans. ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩৮ বছর বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনায় শ্রীরামপুর মিশনের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
♦ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশন ও প্রেসের প্রতিষ্ঠা হলেও শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের প্রাণপুরুষ উয়িলিয়াম কেরি -র দু'বছর আগে থেকেই কাঠের মুদ্রণ যন্ত্র ও দেশীয় ভাষায় অর্থাৎ বাংলা হরফ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং ১৮০০ থেকে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সম্ভবত শ্রীরামপুর মিশন প্রেস লোহার মুদ্রণ যন্ত্রও নিয়ে আসে ।
♦ মিশনারি জশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ড এবং চার্লস গ্রান্ট প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে কেরি সাহেব বই ছাপার উদ্যোগ নেন এবং বই ছাপার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ভূমিকা নেন 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' ।
♦ শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রথম ছাপা বই ছিল বাইবেলের অনুবাদ 'মঙ্গল সমাচার মতীয়ের রচিত' । প্রথম দিকে মিশন মূলত ধর্মীয় বই অনুবাদ করত এবং এখান থেকে ছাত্রদের জন্য অসংখ্য পাঠ্যপুস্তক, পত্রপত্রিকা যেমন— মাসিক পত্রিকা 'দিগদর্শন', সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সমাচার দর্পণ' প্রভৃতি ছাড়াও অন্যান্য গ্রন্থ যেমন— মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের 'বত্রিশ সিংহাসন', 'রাজাবলি', 'প্রবোধচন্দ্রিকা', রামরাম বসু রচিত 'লিপিমালা', 'জ্ঞানোদয়' হরপ্রসাদ রায়ের 'পুরুষ পরীক্ষা', কেরির 'বাংলা ব্যাকরণ', 'ইঙ্গবঙ্গ অভিযান' প্রভৃতি প্রকাশিত হয় ।
♦ প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও কিছুটা পরে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি -র সঙ্গে সহযোগী হিসাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনায় শ্রীরামপুর মিশন উদ্যোগী হয়েছিল । একটিমাত্র কাঠের মুদ্রণযন্ত্রকে সম্বল করে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস তার যাত্রা শুরু করলেও ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রণযন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৮টিতে । ১৮০১ খ্রিঃ থেকে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শ্রীরামপুর থেকে চল্লিশটি ভাষায় দু-লক্ষ বারো হাজার বই প্রকাশিত হয়েছিল ।
৪.২৩ সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো : দেশবিভাগ (১৯৪৭) জনিত উদবাস্তু সমস্যা ।
Ans. ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার প্রথম পাঁচ বছরে উদ্বাস্তু সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছিল । পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু উত্তর পশ্চিম ভারতে মূলত পাঞ্জাবে আশ্রয় নিয়েছিল । অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশ থেকে আগত উদ্বাস্তু ও শরনার্থীরা জীবন ও জীবিকার স্বার্থে আশ্রয় নিয়েছিল মূলত এপার বাংলা অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় ।
♦ নিরাপত্তাজনিত অভাব, ধর্ম ও সংস্কৃতিগত সাদৃশ্য এবং বাংলা ভাষা স্বাচ্ছন্দ্যের দরুন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুকে আশ্রয় এবং পুনর্বাসন দেয়া ছিল খুবই কঠিন কাজ । বিপুল জনসংখ্যা, পরিকাঠামো জনিত সমস্যা, কিছুটা কেন্দ্রীয় স্তরের উদাসীনতা উদ্বাস্তু সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল । বিপুল সংখ্যক শরণার্থী প্রাথমিকভাবে স্টেশনে, ফুটপাতে, খোলা আকাশের নীচে এবং বিভিন্ন উদ্বাস্তু ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল । পরে অবশ্য ছিন্নমূল এইসব মানুষজন নিজ উদ্যোগে কলোনি গড়ে তোলেন আবার কোথাও বা সরকারি সাহায্যে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় ।
♦ উদ্বাস্তু মানুষদের অসহায়তা, জীবনযন্ত্রণা, ভয়াবহ স্মৃতি এবং পূর্বতন গ্রাম বা শহরের মধুর স্মৃতি ধরা পড়েছে তাদের আত্মকথা, স্মৃতিকথা এবং সমসাময়িক সাহিত্যে । এই দেশভাগ, দাঙ্গা এবং অভিপ্রয়াণের জ্বলন্ত সাক্ষী ছিলেন যেমন নারীরা, তারাও তাদের ভয়াবহ স্মৃতি, যন্ত্রণা সর্বোপরি সংগ্রামকে কাগজে কলমে বা আলাপচারিতায় তুলে ধরেছেন ।
৪.২৪ হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়েছিল ?
Ans. স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে হায়দ্রাবাদ সবচেয়ে বড় এবং সম্পদশালী দেশীয় রাজ্য ছিল । স্বাধীন ভারতের অখন্ডতা রক্ষা ও নিরাপত্তার দিক থেকেও হায়দ্রাবাদ ছিল গুরুত্বপূর্ণ । সর্বোপরি হায়দ্রাবাদে নিজামের স্বৈরতন্ত্র এবং সামন্ত্রতান্ত্রিক জুলুমের বিরুদ্ধে হায়দ্রাবাদের সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ এবং গণতন্ত্রের প্রতি তীব্র আকুতি হায়দ্রাবাদের ভারত ভুক্তির বিষয়টি জোরালো করে তুলেছিল ।
♦ অন্যদিকে নিজামের ভারতবিরোধী অবস্থান মজলিস-ইতেহাদ-উল-মুসলিমিন এর মত সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি সর্বোপরি গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষদের উপর নিজামের রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তিকে অনিবার্য করে তুলেছিল ।
♦ এমতাবস্থায় ভারত সরকার প্রথমে অর্থনৈতিক অবরোধ করে এবং পরে নিরুপায় হয়ে মেজর জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্বর সামরিক অভিযান অপারেশন 'পোলো' প্রেরণ করেন । ১৮ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে আসে । শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জানুয়ারি হায়দ্রাবাদ আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতভুক্ত হয় ।
৪.২৫ নারী ইতিহাসের ওপর একটি টীকা লেখো ।
Ans. বিশ শতকের মধ্য ভাগ থেকে সারা পৃথিবীতে নারীকেন্দ্রিক চেতনা ও নারী আন্দোলনের জোয়ার লক্ষ্য করা যায় । নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চা ও নিম্নবর্গীয় ইতিহাসচর্চার মধ্যে নারীদের প্রান্তিক অবস্থান আলোচনার আঙ্গিনায় উঠে আসে । ১৯৭০ এর দশক থেকে নারী ইতিহাসচর্চা ইতিহাসের একটি স্বতন্ত্র ধারারূপে গুরুত্ব লাভ করে । Gerda Lerner -এর মতে, নারীমুক্তির জন্য নারী ইতিহাসচর্চা আবশ্যক । নারী ইতিহাসচর্চার মধ্যে উঠে এসেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর যোগদান, অভিজ্ঞতা, অবস্থান, ভূমিকার কথা । নারীর অধিকার বা অধিকারহীনতা, নারী স্বাধীনতা, প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সম্পর্ক, লিঙ্গ বৈষম্য, নারীবাদী সাহিত্য, নারী আন্দোলন সমস্তই নারী ইতিহাসচর্চার পরিসরে আলোচিত হচ্ছে । পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশিত হয় । বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, নারীশিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলি ইতিহাসের কালানুক্রমে নারীদের অবস্থান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আলোচনায় উঠে এসেছে । পিতৃতন্ত্র কীভাবে উৎপাদনের উপাদান, জমি এবং সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে সেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে নারী ইতিহাসচর্চা । Gerda Lerner, জেরাল্ডিন ফোর্বস, জে. কৃষ্ণমূর্তি, যশোধারা বাগচী, বীনা আগরওয়াল প্রমুখ নারী ইতিহাসচর্চাকারীদের মধ্যে অগ্রগণ্য ।
৪.২৬ স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মসংস্কারের আদর্শ ব্যাখ্যা করো ।
Ans. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মীয় চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল 'নব্য বেদান্তবাদ' । বিবেকানন্দ প্রাচীন অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন । স্বামীজীর বেদান্ত তত্ত্বের প্রচার আর তার সহায়ক উপাদানরূপে কর্মযোগের প্রচার করে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের মুক্তির পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন । কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, ধনী-দরিদ্র্যের বিভেদ দূর করে তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও কর্মশক্তিতে উদ্দীপ্ত হওয়ার আহ্বান জানান । বিবেকানন্দ দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তার মুক্তির জন্য সকলকেই শামিল হওয়ার আহ্বান জানান । বিবেকানন্দের নব্য বেদান্তের অভিমুখ ছিল একটাই— জগতের কল্যাণেই নিজের মোক্ষলাভ । তাঁর ধর্মদর্শন ঈশ্বরের সেবা প্রকৃতপক্ষে মানুষের সেবা করা ।
৪.২৭ ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছিল কেন ?
Ans. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পরে এদেশে যেসব উপজাতি বিদ্রোহ হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হল ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ । বিভিন্ন অঞ্চলে শান্ত ও নিরীহ সাঁওতালরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ।
বিদ্রোহের কারণ:- ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি হল—
(i) রাজস্বের হার বৃদ্ধি:- সাঁওতালরা সাধারণত অরণ্য সঙ্কুল জমিতে চাষবাস করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করত কিন্তু নতুন ভূমি রাজস্ব আইন প্রণয়ন হলে সাঁওতালদের সেই জমির ওপর উচ্চহারে কর আরোপ করা হয় ।
(ii) মহাজনদের প্রতারণা:- মহাজনরা সাঁওতালদের নানাভাবে ঠকাত । নগদ টাকায় খাজনা মেটাতে হত বলে সাঁওতালরা মহাজনদের কাছে নগদ অর্থে ফসল বিক্রি করত এবং অন্যায়ভাবে বেশি সুদ আদায় করত ।
(iii) ব্যবসায়ীদের অত্যাচার:- ব্যবসায়ীরা এদেশে দোকান খুলে বসে সাঁওতালদের নানাভাবে ঠকাত । তারা কেনারাম ও বেচারাম বাটখারা ব্যবহার করে সাঁওতালদের ঠকাত ।
(iv) বেগারশ্রম :- ভারতে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ শুরু হলে ব্রিটিশ ঠিকাদাররা সাঁওতালদের বেগার শ্রম দানে বাধ্য করত ।
(v) নিম্ন মজুরি :- মহাজন ও জমিদাররা নিম্ন মজুরিতে সাঁওতালদের বলপূর্বক জমিতে খাটিয়ে নিত । এই কারণে মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের প্রচুর ক্ষোভ জমা ছিল ।
(vi) ধর্মান্তরকরণ:- খ্রিস্টান মিশনারিরা সাঁওতালদের অঞ্চলে বলপূর্বক প্রবেশ করে তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করত ।
সর্বোপরি অরণ্যবাসী সাঁওতালরা অরণ্যের অধিকার রক্ষায় শেষ অবধি বিদ্রোহের পথই বেছে নিয়েছিল ।
৪.২৮ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের কীরূপ মনোভাব ছিল ?
Ans. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ সাধারণভাবে সমর্থন করেননি ।
♦ ইংরেজদের উপর বিশ্বাস :- তখনকার পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ইংরেজদের প্রতি অধিক আগ্রহ পোষণ করত । তারা ভাবে এই সময় ভারতের ওপর থেকে ইংরেজ শক্তি চলে গেলে ভারতকে সঠিকভাবে চালানো যাবে না । তখনকার বাঙালি শিক্ষিত সমাজ ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের পক্ষে কল্যাণকর বলে মনে করত ।
♦ বিদ্রোহের অযৌক্তিকতা :- ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহকে সমকালীন বাঙালি সমাজ অপ্রয়োজনীয় মনে করেছিল । বিদ্রোহে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে ভারতে আবার মুসলিম শাসনের দিন আসতে পারে, এই আশঙ্কা মূলত হিন্দু বাঙালিদের ছিল ।
♦ অন্যান্য বাঙালিদের অভিমত :- বিভিন্ন বাঙালি যেমন হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ বিদ্রোহের উদ্দেশ্যের প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করেন ।
♦ তখনকার যুগে বাঙালি মধ্যবিত্তের এক বিরাট অংশ ইংরেজদের অধীনে চাকরি করত, তাই তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যেতে চায়নি ।
♦ 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে তখন শিক্ষিত বাঙালি সমাজের সমর্থনের অভাবে বাংলায় তা খুব একটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি ।
৪.২৯ ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষাবিস্তারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো ।
Ans. উনবিংশ শতকে বাংলাতে ছাপাখানা শিক্ষাবিস্তারের প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল ।
♦ ছাপাখানার প্রসার :- পর্তুগিজরা প্রথম ১৫৫৬ সালে এদেশে আধুনিক ছাপা-যন্ত্র নিয়ে আসে । এর পরে জেমস অগাস্টাস হিকি কলকাতায় এবং চার্লস উইলকিন্স চুঁচূড়াতে একটি ছাপাখানা তৈরি করে । এর প্রভাবে ছাপার বইয়ের সংখ্যা বাড়ে ।
♦ বিভিন্ন বই প্রকাশ :- শ্রীরামপুর মিশনের মিশনারী উইলিয়াম কেরি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস নামে ছাপাখানা স্থাপন করলে এদেশের শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে যায় । এখান থেকে প্রকাশিত বইপত্রগুলি জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে । এছাড়া ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি, ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তক প্রচুর ছাপিয়ে শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষের হাতে পৌছে দেয় । শ্রীরামপুরের ছাপাখানা ছাড়াও হিন্দুস্থানি প্রেস,পার্সিয়ান প্রেস ও সংস্কৃত প্রেস থেকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বইপত্র ছাপা হত । মদনমোহন তর্কালঙ্কারের 'শিশুশিক্ষা', বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়', গোবিন্দপ্রাসাদ দাসের 'ব্যাকরণ সার' ইত্যাদি এ যুগে শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
৪.৩০ কারিগরি শিক্ষার বিকাশে 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' -এর কী ভূমিকা ছিল ?
Ans. স্বদেশী আন্দোলনের যুগে যে সকল মনীষী বাংলায় কারিগরি শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন তারকনাথ পালিত । তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে জুলাই কলকাতায় 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' নামে একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় । বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে মিশে যায় । এখানে কলা বিদ্যার পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা, রসায়ন প্রযুক্তি, শিল্প প্রযুক্তি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হয় । বাংলার বহু শিক্ষিত যুবক এখান থেকে কারিগরিবিদ্যা লাভ করে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে । কারিগরি শিক্ষার বিকাশে এই প্রতিষ্ঠান অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছিল ।
৪.৩১ দলিত আন্দোলন বিষয়ে গান্ধি-আম্বেদকর বিতর্ক নিয়ে একটি টীকা লেখ ।
Ans. ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে গান্ধি-আম্বেদকর বিতর্ককে কেন্দ্র করে এক নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয় । গান্ধি ও আম্বেদকররা পরস্পর বিরোধী মতবাদে সোচ্চার হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে ।
♦ বিতর্কের কারণ :- দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে আম্বেদকর বলেন যে দলিতরা সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় তারা সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এবং এর প্রভাবে তারা বেশি সংখ্যক দলিতদের নির্বাচনে জেতাতে ব্যর্থ হয় । তাই আম্বেদকর দলিতের পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান ।
♦ গান্ধিজীর মতবাদ :- এর প্রত্যুত্তরে গান্ধিজী বলেন যে দলিতরা সংখ্যালঘিষ্ট নয় তারা হিন্দু সম্প্রদায় ভুক্ত । তাই তিনি দলিতদের পৃথক নির্বাচনের দাবির বিরোধিতা করেন ।
♦ সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা :- এমতাবস্থায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘোষণা করেন । এই নীতিতে বলা হয় যে হিন্দু সমাজকে বর্ণ হিন্দু ও দলিত হিন্দু এই দুটি ভাগে ভাগ করা হবে ।
♦ পুণা চুক্তি :- এই ঘটনার প্রতিবাদে গান্ধিজী ইয়েরওয়াড়া জেলে অনশন শুরু করেন, এবং গান্ধিজীর প্রাণ সংশয় দেখা দিলে আম্বেদকর গান্ধিজীর সাথে পুণা চুক্তি স্বাক্ষর করেন ।
♦ মূল্যায়ন :- পরিশেষে উল্লেখ্য যে এই বিতর্কের ফলে গান্ধি-আম্বেদকর সম্পর্ক তিক্ত হয়নি । তবে এর ফলে আম্বেদকর দলিতদের পৃথক নির্বাচনের দাবি থেকে সরে আসেন এবং যৌথ নির্বাচনের নীতি মেনে নেয় ।
৪.৩২ স্বাধীনতার পরে ভাষার ভিত্তিতে ভারত কীভাবে পুনর্গঠিত হয়েছিল ?
Ans. ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও যৌতিকতা খতিয়ে দেখার জন্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বিচারপতি এস.কে. ধর -এর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল । এই কমিশনের নাম 'ভাষাভিত্তিক প্রদেশ কমিশন' । এই কমিশন মনে করেছিল যে, ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠন করলে জাতীয় ঐক্য বিঘ্নিত হবে ও প্রাদেশিক জটিলতা দেখা দেবে । তাই বিষয়টি নিয়ে আবার নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয় । এবং ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে জহরলাল নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং কংগ্রেস সভাপতি পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে কংগ্রেস একটি কমিটি গঠন করে । এই কমিটিও সেই সময়ে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিপক্ষে রিপোর্ট দেয় । এই অবস্থায় ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় । পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার মাদ্রাজ প্রদেশের তেলেগু ভাষাভাষী অঞ্চলগুলি একত্রিত করে পৃথক অন্ধপ্রদেশ গঠন করে । তামিল ভাষাভাষীদের জন্য সৃষ্টি হয় তামিলনাড়ু । অন্ধ্রপ্রদেশের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীগুলিও নিজেদের জন্য আলাদা রাজ্য দাবি করতে থাকে ।
👉বিভাগ—ঙ:
৫ পনেরো-ষোলোটি বাক্যে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: ৮x১=৮
৫.১ শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী ? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলোচনা করো । (৫+৩)
Ans. ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে চার্টার অ্যাক্ট বা সনদ আইন পাস করে । এই আইনের একটি ধারায় বলা হয় যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিবছর এক লক্ষ টাকা ভারতীয় জনশিক্ষার জন্য ব্যয় করবে । সেই অনুসারে জনশিক্ষা নীতি নির্ধারণের উদ্দেশ্য ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে 'জনশিক্ষা কমিটি' গঠিত হয় । এই কমিটি কলকাতায় একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রামমোহন রায় বড়লাট আমহার্স্টকে চিঠি লিখে সংস্কৃত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের দাবি জানান । এভাবে এদেশে প্রাচ্য না প্রাশ্চাত্য কোন ধরনের শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয় যা 'প্রাচ্যবাদী বনাম পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত ।
প্রাচ্যবাদের সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ.টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমুখ । অন্যদিকে পাশ্চাত্যবাদের সমর্থকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন টমাস ব্যাবিংটন মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ, কলভিন প্রমুখ । উগ্র পাশ্চাত্যবাদী মেকলে বলেন যে, "ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি তাক ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ" । তিনি ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের দাবি জানিয়ে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্কের কাছে একটি প্রস্তাব দেন যা 'মেকলে মিনিটস' বা 'মেকলে প্রস্তাব' নামে পরিচিত । বেন্টিং নিজেও ইংরেজি শিক্ষার অনুকুলের মত দেন । দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ভারতে শিক্ষা নিয়ে যে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছিল এভাবে তার অবসান ঘটে । স্যার চার্লস উডের নির্দেশনামার ভিত্তিতে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৮৫৭ অনুসারে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে জানুয়ারি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পাশ্চাত্য ধাঁচের বিশ্ববিদ্যালয় । প্রথম থেকেই পূর্ব, উত্তর ও মধ্য ভারতের বৃহদংশের কলেজগুলির শিক্ষা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হত । প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রী প্রদান করত । ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এটি দেশের বৃহত্তম গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয় । এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভারতীয় উপাচার্য ছিলেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় উপাচার্য থাকার সময় এই বিশ্ববিদ্যালয় উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছায় । বাংলা তথা ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ।
৫.২ সংক্ষেপে মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) চরিত্র বিশ্লেষণ করো ।
Ans. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে এই বিদ্রোহের চরিত্র নিয়ে নানা মতবাদ উত্থাপিত হয়েছে । বেশির ভাগ ব্রিটিশ লেখক একে সিপাহী বিদ্রোহ বলে মেনে নিলেও কারো কারোর কাছে এটা একটা জাতীয় বিদ্রোহ । অনেকে মনে করেন এটা সামন্ত বিদ্রোহ ছাড়া আর কিছুই নয় । ব্রিটিশ সেনা— জেনারেল আউটরাম একে 'মুসলমানদের ষড়যন্ত্র' বলেছেন ।
সিপাহী বিদ্রোহ:- স্যার চার্লস রেকস, জন সিলি, আর্ল রবার্টস প্রমুখদের মতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ছিল সিপাহী বিদ্রোহ । সমকালীন বিদগ্ধ ভারতীয়দের মধ্যে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দাদাভাই নৌরোজি, অক্ষয় কুমার সরকার, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখেরা এই বিদ্রোহকে সিপাহী বিদ্রোহ বলে মেনে নিয়েছেন । ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তার "Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857" গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে সিপাহী বিদ্রোহ বলেছেন । এ বিষয়ে তাদের মতামতগুলি হল—
(i) বিপ্লবীদের কোনো পূর্ণ পরিকল্পনা ছাড়াই এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল ।
(ii) বিপ্লবীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ছিল না ।
(iii) মহাবিদ্রোহের শতবার্ষিকী সভায় রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন— "The so called First national war of independence in 1857 is neither First nor national nor war of independence."
জাতীয় বিদ্রোহ :- ডিসরেলি, নর্টন, ডাফ, হোমস প্রমুখেরা ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন । বিনায়ক দামোদর সাভারকার এই বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেছেন । এই বিষয়ে তাদের মতামতগুলি হল —
(i) পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলির তুলনায় ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে গণ সমর্থন ছিল প্রবল ।
(ii) সুরেন্দ্রনাথ সেন স্পষ্ট করে বলেছেন যে বিদ্রোহের নেতা হিসাবে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে মেনে নেওয়ায় এই বিদ্রোহ এক অন্য মাত্রা পায় ।
সামন্ত বিদ্রোহ :- রজনীপাম দত্ত, এরিখ স্টোকস, জওহরলাল নেহেরু, সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখেরা এই বিদ্রোহকে সনাতন পন্থীদের বিদ্রোহের সাথে তুলনা করে একে সামন্ত বিদ্রোহ বলেছেন । জওহরলাল নেহেরু তাঁর 'Discovery of India' গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে সনাতন পন্থীদের বিদ্রোহ বলেছেন ।
মূল্যায়ন:- অবশেষে উল্লেখ্য যে সকল ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ভাবধারা গড়ে ওঠেনি । শিখ, গোর্খা, রাজপুত প্রভৃতি জাতিগুলিও এই বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল । সুশোভন সরকার বলেছেন "হজরত মহল, কুনওয়ার সিং, লক্ষীবাঈ প্রভৃতি সামন্ত জমিদার ও তালুকদারদের হাতে বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল বলে একে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দেওয়া যায় না ।" কিন্তু একথা অস্বীকার করা যায় না যে, নানা ত্রুটি-বিভাজন সত্ত্বেও এই বিদ্রোহে গণচরিত্রের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয় । ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের সমন্বিত বিদ্রোহের মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক রূপটিকেও অস্বীকার করা যায় না ।
৫.৩ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ কর ।
Ans. উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নারীসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্ করা যায় । ভগিনী নিবেদিতা ভারতের বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন । যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির সাথে তার প্রত্যক্ষ যোগ ছিল । ভারতের বিপ্লববাদের জননী মাদাম কামা ভারতের বাইরে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠনে ভূমিকা নেন । অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পরবর্তীকালে দিপালী সংঘের মহিলা সদস্যরা যেমন— প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত সহ অনেকেই সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন ।
বিশ শতকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীদের শামিল করার কাজে সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ চরম বামপন্থী রাজনীতিক লীলা নাগ (রায়) -এর অসামান্য অবদান রয়েছে । তিনি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় 'দীপালি সংঘ' নামে একটি নারী সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেন । প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন দীপালি সংঘের অন্যতম সদস্যা । এই সংঘের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের প্রস্তুত করে তোলা । এখানে লাঠি খেলা, শরীরচর্চা, অস্ত্র চালনা প্রভৃতি শিক্ষণ দেওয়া হত ।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার মাস্টারদা সূর্য সেনের সশস্ত্র বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছিলেন । তিনি টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের অফিস ধ্বংস, পুলিশ লাইন দখল, জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় । মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রীতিলতার মৃত্যু হয় । পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন ।
১৯২০ -র দশকের অন্যতম নেত্রী ছিলেন কল্পনা দত্ত । তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'র চট্টগ্রাম শাখায় যোগ দেন । তিনি ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব পান । কিন্তু আক্রমণের এক সপ্তাহ আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন । তবে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে দেখা যায় যে মূলত শিক্ষিত নারীরাই এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন । তাছাড়া নারীদের বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলাই সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ।
৫.৪ ঊনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল ?
Ans. ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার যেমন— সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতি অমানবিক প্রথার উচ্ছেদ সাধন এবং নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, নারীজাতির সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ।
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য তৈরি হলে ব্রাহ্মসমাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে ।
♦ রাজা রামমোহনের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামমোহন তাঁর ধর্মমতকে কোনো বিশেষ সম্প্রদায় রূপে গড়ে তুলতে চাননি, কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজকে একটি বিশেষ সম্প্রদায় রূপে গড়ে তোলেন এবং 'ব্রাহ্মধর্মের অনুষ্ঠান পদ্ধতি' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন । দেবেন্দ্রনাথের উদ্যোগে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে 'তত্ত্ববোধিনী সভা' এবং ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে 'তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা' স্থাপিত হয় এবং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার চালান । কিন্তু অচিরেই বেদের অভ্রান্ততা, ব্রাহ্ম আচার্যদেব উপবিত ধারণ প্রভৃতি নানা প্রশ্নে মতপার্থক্য তৈরি হলে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজ থেকে বহিস্কৃত হয়ে কেশবচন্দ্র সেন ও তার অনুগামীরা 'ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ' প্রতিষ্ঠা করেন । দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজ 'আদি ব্রাহ্মসমাজ' নামে পরিচিত হয় ।
♦ কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে সমাজ সংস্কার আন্দোলন উনিশ শতকে এক নতুন মাত্রা পায় এবং তিনি ইন্ডিয়ান মিরর, বামাবোধিনী পত্রিকায় নারীশিক্ষার প্রসার, নারী স্বাধীনতা, অসবর্ণ বিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার চালান । নারী কল্যাণের জন্য ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে 'বামাবোধিনী' ও ব্রাহ্মিকা সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন । কেশবচন্দ্রের আন্দোলনের চাপে সরকার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে 'তিন আইন' পাস করে— বাল্য বিবাহ ও বহুবিবাহ রদ, অসবর্ণ বিবাহকে আইন সিদ্ধ করে । ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে 'সঙ্গতসভা' প্রতিষ্ঠা করে নিপীড়িত মানুষের সেবা ও ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন ।
কিন্তু কেশবচন্দ্রের খ্রিস্টপ্রীতি, চৈতন্যপ্রীতি, গুরুবাদ ও ভক্তিবাদে আকর্ষণ, হিন্দু রীতিতে নাবালিকা কন্যা সুনীতি দেবী বিবাহ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের অভ্যন্তরে প্রবল দ্বন্দ্ব তৈরি করে । শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখরা ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মে 'ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ' থেকে বেরিয়ে গিয়ে 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ' প্রতিষ্ঠা করেন । বিভাজনের পর কেশবচন্দ্রের ব্রাহ্মসমাজের নাম হয় 'নববিধান ব্রাহ্মসমাজ' ।
♦ 'সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ' এর নেতা শিবনাথ শাস্ত্রী নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা প্রভৃতি কাজে আত্মনিয়োগ করেন । বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রচার চালান ।
৫.৫ মানুষ, প্রকৃতি ও শিক্ষার সমন্বয় বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও ।
Ans. ব্রিটিশ ভারতে প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রাণের কোন সম্পর্ক ছিল না বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন । তাঁর মতে দেশের সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতিচর্চা ভিন্ন শিক্ষালাভ অসম্পূর্ণ । রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কল্পনার অবাধ বিকাশ ঘটানো এবং সেই সঙ্গে তার আত্মউপলব্ধি তৈরি করা । মানুষের মনের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্চা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা । 'আশ্রমের রূপ ও বিকাশ' নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— এই পড়াটাই শেখা এই ধারণা যেন ছাত্রের মধ্যে না জন্মায়, শিক্ষা হবে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার একটি অঙ্গ, চলবে তার সঙ্গে একতালে এবং এক সুরে ।
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির খোলামেলা পরিবেশে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন । তিনি মনে করতেন প্রকৃতির সংস্পর্শেই শিশুমনের সঠিক বিকাশ সম্ভব, কারণ শিশু শৈশবে মস্তিষ্কের চাইতে ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে অধিক শিক্ষালাভ করে । তাই রবীন্দ্রনাথ শহরের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ ত্যাগ করে প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছতলায় শিক্ষা দানের কথা বলেন । 'শিক্ষা সমস্যা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন— বিদ্যালয়ে অবশ্যই কিছুটা জমি থাকবে, যেখানে ছাত্ররা চাষের কাজে সাহায্যের সাথে গোপালনও করবে । প্রাচীন ভারতের আশ্রম ও গুরুকুলকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক জীবনে আনতে চেয়েছিলাম, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ পালিত হবে নিয়ম ও নিষ্ঠার সঙ্গে । আশ্রম ও গুরুকুলে থেকেও ছাত্ররা যাতে স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ এবং আত্মকর্তৃত্বের অধিকার পায় সেদিকেও তিনি দৃষ্টি দিয়েছিলেন । মুক্ত চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ 'শিক্ষার মিলন' শীর্ষক প্রবন্ধে পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও আদর্শের সঙ্গে ভারতীয় আদর্শের সমন্বয়ের কথা বলেন । পাশ্চাত্য জগতের জ্ঞানভান্ডারকে আয়ত্ত করার আহ্বান জানান । ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবল সমালোচনা করে রবীন্দ্রনাথ বিকল্প শিক্ষা-ধারণার প্রতিষ্ঠান গঠনের চিন্তাভাবনা করেন । পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে লালন করে দেহ, মন ও আত্মার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে শিশুকে জাতির উপযোগী দক্ষ ও কল্যাণকামী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শান্তিনিকেতনের মধ্যে তিনি ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মবিদ্যালয় বা পাঠভবন স্কুল নির্মাণ করেন ।
শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক বিদ্যালয় পাঠভবনকে আরও বৃহত্তর রূপ দিতে রবীন্দ্রনাথ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে একে মহাবিদ্যালয়ে পরিণত করেন । ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থে তিনি এটি গড়ে তোলেন । তিনি এর নাম দিয়েছিলেন বিশ্বভারতী । ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার বিশ্বভারতীকে পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিলে এর নাম হয় 'বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়' ।
বিশ্বভারতীতে কলাবিদ্যার পাশাপাশি অর্থশাস্ত্র, কৃষিতত্ত্ব, স্বাস্থ্যবিদ্যা, পল্লিউন্নয়ন সহ সমস্ত ব্যবহারিক বিজ্ঞানের পাঠদানের মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষা সমন্বয় ঘটানো হয় ।
৫.৬ বিংশ শতকের ভারতে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা আলোচনা কর ।
Ans. রুশ বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখার্জি, মহম্মদ আলি সহ ২৪ জন প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের নিয়ে রাশিয়ার তাসখন্দে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর 'ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি' গড়ে তোলেন, সম্পাদক হন মহম্মদ সিদ্দিকি । তবে ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশের কানপুরে, সম্পাদক হন সচিদানন্দ বিষ্ণু ঘটে । দুবার জন্মের জন্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে 'দ্বিজ' বলা হয় ।
কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হওয়ার সাথে সাথে ভারতের শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন অন্যমাত্রা লাভ করে । তবে মানবেন্দ্রনাথ রায় কৃষক অপেক্ষা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন, কারণ জমির প্রতি কৃষকদের লোভকে তিনি পুঁজিবাদী মনোভাব বলে মনে করতেন । ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কৃষক ও শ্রমিক শোষণ বন্ধ করা, জমিদারি প্রথার বিলোপ, সাম্যবাদের প্রসার ঘটানো, কৃষক শ্রমিক সাধারণকে স্বাধীনতা আন্দোলনে শামিল করা এবং ব্রিটিশ অধীনতা মুক্ত পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করা । বামপন্থীরা শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা— সোসালিস্ট, ইনকিলাব, গণবাণী, লাঙ্গল, লেবার কিষান গেজেট, কীর্তি প্রভৃত প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নও তৈরি হয় যেমন- 'গিরনি কামগড় ইউনিয়ন' ।
শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে মাদ্রাজের সমুদ্রতটে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে সিঙ্গায়াভেল্লু চেট্টিয়ারের নেতৃত্বে প্রথম মে দিবস পালিত হয় । কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য ঘটাতে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আহমেদ, কাজী নজরুল ইসলাম, হেমন্ত সরকার, মুজাফফর আহমেদ, নলিনী গুপ্ত, ধরণী গোস্বামী প্রমুখরা 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি' গড়ে তোলেন । এই দলই প্রথম প্রস্তাব গ্রহণ করে— সম্পূর্ণ স্বাধীনতা কংগ্রেসের লক্ষ্য হওয়া উচিত ।
বামপন্থীদের প্রভাবে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে । ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রায় ২০৩টি শ্রমিক ধর্মঘট হয় যাতে প্রায় ৫ লক্ষ শ্রমিক যোগ দেয় । ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলার চটকলগুলিতে শ্রমিকরা সর্বাত্মক ধর্মঘটে নামে এবং দেড় লক্ষ শ্রমিক এতে যোগ দেয় । বামপন্থীদের ব্যাপক প্রসার, শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে তাদের প্রভাব এবং কলকারখানায় ক্রমাগত ধর্মঘট ব্রিটিশ সরকারকে আতঙ্কিত করে তোলে । শ্রমিকদের থেকে কমিউনিস্টদের আলাদা করা এবং তাদের দমন করার জন্য সরকার 'জননিরাপত্তা বিল' পাস করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩৩ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে 'মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা' শুরু করে ।
১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে জুলাই ব্রিটিশ সরকার ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনী ঘোষণা করলে বামপন্থীরা জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত গণ আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মপন্থা গ্রহণ করে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে অভিহিত করে বামপন্থীরা এই যুদ্ধে ব্রিটেনের বিরোধিতা করে । কিন্তু জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করলে তারা ব্রিটেনের বিরোধিতা থেকে সরে আসে । তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বামপন্থীরা নতুন উদ্যমে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামে । আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাপতি রশিদ আলির বিচার ও কারাদন্ডকে কেন্দ্র করে তারা আন্দোলনে নামে এবং ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি 'রশিদ আলি দিবস' পালন করে । স্বাধীনতার প্রাককালে কৃষক আন্দোলন তেভাগা ও তেলেঙ্গানা আন্দোলনেও তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ । তবে দেশভাগের ক্ষেত্রে বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী, যে কারণে তারা বিভিন্নভাবে সমালোচিত হন ।
৫.৭ বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও । বিদ্যাসাগর কতটা সাফল্য অর্জন করেছিলেন ? ৫ + ৩
Ans. রামমোহনের উদ্যোগ ও আন্দোলনের ফলে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা আইনত নিষিদ্ধ হলেও বিধবাদের ভবিষ্যৎ কী এ সম্পর্কে তেমন কোন উদ্যোগ তাঁর পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি । এ বিষয়ে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।
♦ বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমনে চেতনার প্রসারে বিদ্যাসাগর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় প্রথম বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন, পরের বছর ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে "বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব" নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন । পরাশর সংহিতা থেকে উদ্ধৃতি তুলে বিদ্যাসাগর বলেন— বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণভাবে শাস্ত্রসম্মত ।
♦ বিদ্যাসাগর বিধবার পুনর্বিবাহ নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে তাঁর বিরোধিতায় নেমে পড়েন শোভাবাজার রাজবাড়ির রাধাকান্ত দেব ও তাঁর ধর্মসভা । বিদ্যাসাগরের বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে এসময় কমপক্ষে তাঁরা ৩০টি পুস্তিকা প্রকাশ করেন । ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এই বিরোধ নিয়ে ছড়া লিখলেন—
"বাঁধিয়াছে দলাদলি লাগিয়াছে গোল
বিধবার বিয়ে হবে বাজিয়াছে ঢোল ।"
♦ সমালোচনার ও বিদ্রুপের জবাব দিতে বিদ্যাসাগরও পিছপা হলেন না । ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে প্রকাশ করলেন 'বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব' নামে দ্বিতীয় পুস্তিকা । শুধু তাই নয় বিধবা বিবাহকে আইনসিদ্ধ করার জন্য ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে ৯৮৭ জনের স্বাক্ষর সম্বলিত এক আবেদন পত্র ভারতীয় আইন সভায় পেশ করেন ।
♦ রাধাকান্তদেবও চুপচাপ বসে রইলেন না, তিনি বিদ্যাসাগরের বিরোধিতা করে বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ৩৬৭৬৩ জনের স্বাক্ষরিত এক দরখাস্ত সরকারের কাছে পাঠালেন । শান্তিপুরের তাঁতিরা এ সময় বিদ্যাসাগরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কাপড়ে লিখলেন—
"সুখে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে,
সদরে করেছে রিপোর্ট বিধবাদের হবে বিয়ে ।"
♦ রাধাকান্তদেব ও রক্ষণশীলদের শত বিরোধিতা সত্ত্বেও বড়লাট ক্যানিং ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুলাই ১৫ নং রেগুলেশন জারি করে বিধবা বিবাহকে আইনসিদ্ধ করেন ।
♦ সাফল্য : বিধবা বিবাহ সংক্রান্ত আন্দোলন এবং এ বিষয়ে সরকারের আইন পাশ বিদ্যাসাগরের এক বড় সাফল্য । তবে কেবল আইন পাশ করে নয়, বিধবা বিবাহকে বাস্তবে কার্যকরী করতেও তিনি উদ্যোগী হন ।
♦ রক্ষণশীলদের শত বিরোধিতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রথম বিধবা বিবাহ সংঘটিত হয় সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে বিধবাপাত্রী কালীমূর্তি দেবীর । এছাড়াও বিদ্যাসাগর নিজ উদ্যোগে ৬০টি বিধবা বিবাহ দেন, এমনকি নিজপুত্র নারায়ণচন্দ্রকেও ভবসুন্দরী নামে এক বিধবার সঙ্গে বিবাহ দেন । বিধবাদের বিবাহের জন্য বিদ্যাসাগর ১৮৭২ সালের ১৫ই জুন 'হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ড' তৈরি করেন ।
♦ বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে দক্ষিণ ভারতের সমাজ সংস্কারক বীরশালিঙ্গম পানতুলু বিধবা বিবাহকে জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে 'বিধবা বিবাহ সমিতি' গড়ে তোলেন । এই কাজের জন্য তাঁকে 'দক্ষিণ ভারতের বিদ্যাসাগর' বলা হয় ।
♦ বিধবা বিবাহের ব্যাপক সাফল্য আসত এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রসারের মাধ্যমে, কিন্তু রক্ষণশীলদের বিরোধিতায় বিধবা বিবাহের তেমন কোন প্রসার ঘটেনি ।
৫.৮ বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও । ৮
Ans. বিকল্প শিক্ষানীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলায় উনিশ শতক থেকে ভাবনাচিন্তা শুরু হয় । গণমুখী এই শিক্ষাব্যবস্থার ঝোঁক ছিল বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর । কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে যোগেশচন্দ্র ঘোষ একটি অর্থভাণ্ডার গড়ে তোলেন, লক্ষ্য বিদেশে গিয়ে কারিগরি বিষয়ে জ্ঞানার্জনকারী ছাত্রদের আর্থিক সাহায্য করা ।
♦ বাঙালির কারগরি কল্পনার ইতিহাস ঘাঁটলে যে নামটি প্রথম উঠে আসে তিনি হলেন গোলকচন্দ্র, যিনি ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে বিলেত থেকে শ্রীরামপুর কাগজ কলে আনা বাষ্পীয় ইঞ্জিন সযত্নে পর্যবেক্ষণ করতে করতে কোনো বিদেশী সাহায্য ছাড়া নিজে একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন নির্মাণ করে ফেলেন ।
♦ ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে সরকার এ দেশে টেলিগ্রাফ লাইন পাতার কাজ শুরু করলে এই বিভাগে প্রথম ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার শিবচন্দ্র নন্দী দুর্বার গতিতে পদ্মার বুকে সাবমেরিন কেবল পাতার কাজ খুব অল্পব্যয়ে শেষ করেন ।
♦ বাংলায় কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে পি.এম. বাগচি অ্যান্ড কোম্পানির অবদান গুরুত্বপূর্ণ । এই কোম্পানি প্রাচ্যে প্রথম কালি, সুগন্ধি প্রসাধন, রাবার স্ট্যাম্প, পঞ্জিকা তৈরি করে ।
♦ কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভূত হয় । কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সরকার ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে 'কলকাতা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ' প্রতিষ্ঠা করে, পরে এর নাম হয় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে কলেজটি হাওড়ায় স্থানান্তরিত করা হয় ।
♦ বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ সরকারি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভব করেন, যার মাধ্যমে তাঁরা জাতীয়তাবাদী ও বাস্তবমুখী শিক্ষাদানের কথা বলেন । এই ভাবনা থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই নভেম্বর পার্কস্ট্রিটে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় । এই আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত মত ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয় । যার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো । জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট অরবিন্দ ঘোষকে অধ্যক্ষ করে বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় । জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে অসংখ্য বিদ্যালয় তৈরি হয় ।
♦ জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উল্লেখযোগ্য সদস্যদের মধ্যে তারকনাথ পালিত, নীলরতন সরকার, রাসবিহারী ঘোষ কারিগরি ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক শিক্ষাদানের পক্ষে ছিলেন । এই উদ্দেশ্যে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তারকনাথ পালিত 'সোসাইটি ফর প্রমোশন অব টেকনিক্যাল এডুকেশন ইন বেঙ্গল' গঠন করেন । ওই বছরই আবার কলকাতার আপার সার্কুলার রোডে 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' নামে একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন । কারিগরি ও প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষার উন্নতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রসার ঘটাতে এই প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ।
♦ আর্থিক ও অন্যান্য কারণে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এর সঙ্গে মিশে যায় । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠান প্রথম কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাঠ দেওয়া শুরু করে । ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে এটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয় । ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এর নামকরণ হয় 'কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি' । ১৯৫৫ তে এটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় ।
৫.৯ বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে নারীসমাজ কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিল ? তাদের আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা কী ? ৫ + ৩
Ans. সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে সারা বাংলা জুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠলে নারীরা দলে দলে এতে শামিল হয় । বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় ।
♦ ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের দিন প্রভাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে হিন্দু মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হিসেবে যে রাখী বন্ধন উৎসব অনুষ্ঠিত হয় তাতে মেয়েরা প্রবল উৎসাহে অংশ নেয় এবং কলকাতা সহ গ্রামে-গঞ্জের মন্দিরে, স্নানের ঘাটে সর্বত্র এই উৎসব ছড়িয়ে দেয় । রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে যে 'অরন্ধন উপবাস দিবস' পালিত হয় তাতেও মেয়েরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় । বঙ্গভঙ্গের দিন বিকালে দুই বাংলার ঐক্যের প্রতীক রূপে কলকাতার আপার সার্কুলার রোডে যে মিলন মন্দিরের ভিত্তি স্থাপিত হয় তাতেও মেয়েরা শামিল হয় ।
♦ স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম ধারা বয়কটে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয় । বিদেশী শাড়ি, চুড়ি সহ রান্নাঘরে বিলাতি লবণ, মসলা ও বিদেশী ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করে, বিদেশি শিক্ষালয় ত্যাগ করে, বিদেশী পণ্যাগারের সামনে পিকেটিং -এ অংশ নেয় ।
♦ বিদেশী দ্রব্য বর্জনের পাশাপাশি নারীরা স্বদেশী দ্রব্য তৈরি ও ব্যবহারের আহ্বান জানায় । স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে স্বর্ণকুমারী দেবী 'সখী সমিতি' ও সরলাদেবী চৌধুরানী 'লক্ষীরভাণ্ডার' স্থাপন করেন । নারীদের দ্বারা সম্পাদিত বিভিন্ন পত্রিকা যেমন— সরলাদেবী চৌধুরানী সম্পাদিত 'ভারতী' সরযুবালা সম্পাদিত 'ভারত মহিলা' বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রচারে বিশেষ ভূমিকা নেয় । অবলা বসুর উদ্যোগে মেরী কার্পেন্টার হলে প্রায় এক হাজার মহিলা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে স্বদেশী শপথ নেয় ।
♦ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন— সরলাদেবী চৌধুরানী, কুমুদিনী বসু, সুবালা আচার্য, হেমাঙ্গিনী দাস, নির্মালা সরকার, লীলাবতী মিত্র প্রমুখরা । কলকাতার বাইরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন— মুর্শিদাবাদের গিরিজা সুন্দরী, বরিশালের সরোজিনী দেবী, বীরভূমের দু'কড়িবালা দেবী, খুলনার লাবণ্যপ্রভা দত্ত, ঢাকার ব্রহ্মময়ী সেন ।
সীমাবদ্ধতা : বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করলেও তাদের আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল—
♦ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চবর্গের বাঙালি হিন্দু পরিবারভুক্ত । কৃষক পরিবারের বা মুসলিম পরিবারের তেমন কোন নারী প্রত্যক্ষভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়নি । মুসলিম পরিবারের খায়রুন্নেসা অবশ্য 'নবনূর' নামক পত্রিকায় 'স্বদেশানুরাগ' নামক রচনা প্রকাশ করে স্বদেশী আন্দোলনের প্রসারে সচেষ্ট হন ।
♦ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীরা প্রায়ই সবাই ছিলেন শহুরে ও অভিজাত । গ্রামের সাধারণ মেয়েদের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনে ছিল না ।
♦ সর্বোপরি নারীরা স্বাধীনভাবে এই আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেননি, তাদের আন্দোলনসূচী ছিল পূর্ব নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত ।
৫.১০ উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সতীদাহ প্রথা বিরোধী প্রচেষ্টাগুলির পরিচয় দাও । রামমোহন রায় কী ভাবে সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনকে সাফল্যমন্ডিত করেন ? ৩ + ৫
Ans. ভূমিকা: খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই ভারতীয় হিন্দুসমাজে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে পাঞ্জাবে এই প্রথার প্রচলন ছিল। গুপ্তযুগের সাহিত্য, ‘রাজতরঙ্গিনী', মঙ্গলকাব্য প্রভৃতিতেও এই প্রথার উল্লেখ আছে। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দিক থেকে সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুঘল যুগে। মুমায়ুন, আকবর, ঔরঙ্গজেব প্রমুখ মুঘল সম্রাট এই প্রথা বন্ধের চেষ্টা করেন।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সতীদাহপ্রথা-বিরোধী প্রচেষ্টা:
উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে সতীদাহ প্রথাবিরোধী প্রচেষ্টার কিছু কিছু উদ্যোগ দেখা যায়—
[i] কেরির অভিজ্ঞতা: ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আগত ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরি ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে একটি হিন্দু নারীর সতীদাহ বা সহমরণের জ্বলন্ত দৃশ্য দেখে কম্পিত হয়ে ওঠেন। তিনি স্থির করেন যে, এই প্রথা বন্ধের লক্ষ্যে তিনি প্রয়াস চালিয়ে যাবেন।
[ii] আর্জি: উইলিয়াম কেরি ও তার দুই সহযোগী মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড ব্রিটিশ প্রশাসনের উপরের স্তরে ঘুরে ঘুরে সতীদাহপ্রথা বন্ধের বিষয়ে আর্জি জানাতে থাকেন। তারা সতীদাহপ্রথার নিষ্ঠুরতা সবিস্তারে লিখে এই প্রথা বন্ধের অনুরোধ করে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির কাছে আর্জি জানান। কিন্তু তাদের উদ্যোগ সফল হয়নি।
[iii] সরকারি নির্দেশিকা: সতীদাহপ্রথা জোর করে বন্ধ করার জন্য সরকার ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে পুলিশদের নির্দেশ দেয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে একটি নির্দেশে বলা হয় যে, পুলিশকে যেন সতীদাহের খবর দেওয়া হয়।
[iv] পুস্তিকা প্রকাশ: সতীদাহপ্রথার বিরোধিতা করে কেরি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে একটি বই প্রকাশ করেন। কিন্তু এই উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলায় সতীদাহপ্রথার প্রকোপ বেড়ে চলে।
রামমোহন রায়ের উদ্যোগে সতীদাহপ্রথা-বিরোধী আন্দোলন:
উনিশ শতকে সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো ও সাফল্যমণ্ডিত আন্দোলন গড়ে তোলেন রাজা রামমোহন রায়।
[i] সূত্রপাত: রামমোহন রায় ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন| শ্মশানে ঘুরে ঘুরে তিনি মৃতের বাড়ির লোকজনকে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। তার প্রতিষ্ঠিত ব্রাম্মসমাজের সদস্যরাও এ কাজে তাকে সহায়তা করেন।
[ii] পুস্তিকা প্রকাশ: রামমোহন সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘সহমরণ বিষয় প্রবর্তক ও নিবকের সম্বাদ’ নামে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহপ্রথার বিরুদ্ধে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। তিনি হিন্দুশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, শাস্ত্রে কোথাও সতীদাহের কথা নেই ।
[iii] আবেদন: রামমোহন ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহপ্রথার অবসানের দাবি করে ভারতের বড়োলার্ট লর্ড বেন্টিঙ্ককে আবেদন করেন। কিন্তু চার্লস মেটকাফ তখন বেন্টিঙ্ককে বোঝান যে, সতীদাহপ্রথা বন্ধ করলে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে।
[iv] আইন পাস: লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারতীয়দের বিদ্রোহের ভয় থেকে বিধবাদের দুর্বিষহ জীবন নিয়ে বেশি ভাবিত ছিলেন। তাই তিনি রামমোহনের আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর সতীদাহপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আইন জারি করেন এবং সতীদাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন।
উপসংহার: সতীদাহপ্রথা নিষিদ্ধ আইন বাংলা ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রদেশেও প্রসারিত হয়। কিন্তু এই আইনের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার হিন্দু সরকারকে জানায়। যে, সরকার তাদের ধর্মীয় প্রথায় হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল আইনটিকে বহাল রাখে।
৫.১১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তা ও শান্তিনিকেতন ভাবনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও । ৫ + ৩
Ans. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাভাবনায় মানুষ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তার শিক্ষাচিন্তার বিষয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। তার শিক্ষাভাবনায় মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তিনি শিক্ষাভাবনার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
[i] মানুষের দুর্দশা দূর করা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথকে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব দিলে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম গ্রামের সাধারণ মানুষের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পান। তিনি উপলব্ধি করেন, গ্রামই হল ভারতের প্রাণ, গ্রামের উন্নতি না হলে দেশের উন্নতি হবে না। এজন্য তিনি গ্রাম সংগঠনের মাধ্যমে পল্লিমঙ্গল সাধনের উদ্যোগ নেন।
[ii] কৃষির উন্নতি: রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন, গ্রামের মানুষের কৃষিভিত্তিক জীবন-জীবিকার উন্নতি না হলে তাদের প্রকৃত উন্নতি হবে না। এজন্য গ্রামের কৃষিবিদ্যার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে আমেরিকায় পাঠান পরে জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলিকেও তিনি ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বিদেশে কৃষিবিদ্যা পড়ার জন্য পাঠান। রথীন্দ্রনাথ, তার বন্ধু ও নগেন্দ্রনাথ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষবাস এবং বীজ, সার, সেচ প্রভৃতির ব্যবহার শুরু করেন।
[iii] কুটিরশিল্পের বিকাশ: রবীন্দ্রনাথ গ্রামের মানুষের মধ্যে কুটিরশিল্পের প্রসারের বিষয়েও চিন্তাভাবনা করেন। তিনি একজন তাতিকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়ে সেখানকার দরিদ্র মানুষকে তাঁতের কাজ শিখতে উৎসাহিত করেন। এ ছাড়া মৃৎশিল্প-সহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের প্রসার ঘটানোর বিষয়েও তিনি চিন্তাভাবনা করেন।
[iv] শিক্ষার প্রসার: গ্রামের মানুষের অজ্ঞতা দূর করার উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন। তাঁর মতে, গ্রামের মানুষের সেবা করতে হলে তাদের সম্পর্কে আগে শিক্ষালাভ করতে হবে। গ্রামের মানুষের মধ্যেও শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
[v] সম্প্রীতির প্রসার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন। সম্ভাব্য সংঘাতের অনুমান করেও তিনি হিন্দু-মুসলমান ব্রাহ্মণচণ্ডালের বিভেদ দূর করে কর্মক্ষেত্রে প্রাণচঞ্চলতা নিয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, “সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে।” এই সাহা ও শেখ কোনো বিশেষ সম্প্রদায় ছিল ।তারা হল আসলে ‘আমলা’ ও ‘চাষা'।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তা:
প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—এ কথা রবীন্দ্রনাথ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তার শিক্ষাভাবনায় প্রকৃতি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছিল। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার শিক্ষা ভাবনার এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। [i] বিশ্ববিদ্যার সাধনা: রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যা সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, “বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ সাধনার ক্ষেত্র। সাধারণভাবে বলা চলে সে সাধনা বিদ্যার সাধনা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বিদ্যা উদ্ভাবন, গৌণ উদ্দেশ্য হল বিদ্যা দান।
[ii] শিক্ষার অবারিত দ্বার: রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশবিদেশের সকল পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যা সাধনার সুযোগ পায়, রবীন্দ্রনাথ তা নিশ্চিন্ত করতে চেয়েছিলেন।
[iii] পাঠক্রমের বৈচিত্র্য: রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে বৈচিত্র্য আনার পক্ষপাতী ছিলেন। এজন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি ভবন, চিনা ভবন, কৃষি অর্থনৈতিক গবেষণাকেন্দ্র, পল্লি শিক্ষাভবন প্রভৃতির প্রতিষ্ঠা হয়। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে দেশবিদেশের বহু খ্যাতনামা পন্ডিত এখানে শিক্ষকতা করতে আসেন।
[iv] মানবসত্তার বিকাশ: রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের মানবসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণকামী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা। উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ নিজে এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় ভাবনা পোষণ করতেন যেখানে মুক্তচিন্তা, সত্যানুসন্ধান, স্বাধীনতা প্রভৃতির দ্বারা মানুষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে| তার এই ভাবনা বাস্তবায়িত হয়ে উঠেছিল তার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে।
৫.১২ বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও । ৮
Ans. বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলন:
ভূমিকা: ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশই ছিল নিম্নবর্ণের দলিত হিন্দু। এই সময় বাংলার দলিত হিন্দুদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত। ১৮৭২ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সারা বাংলাজুড়ে নমঃশূদ্র আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
[i] আন্দোলনের কারণ: ঔপনিবেশিক শাসনকালে বিভিন্ন কারণে বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
(1) সামাজিক অমর্যাদা: উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নমঃশূদ্রদের অস্পৃশ্য বলে মনে করত এবং তাদের ঘৃণার চোখে দেখত।
(2) সীমাহীন দারিদ্র্য: দারিদ্র্য ছিল নমঃশূদ্রদের নিত্যসঙ্গী। কৃষিকাজ ছিল তাদের প্রধান পেশা। এ ছাড়া তারা মাছ ধরা, তঁত বোনা, অন্যের বাড়ি ও জমিতে দিনমজুরের কাজ করা প্রভৃতি অত্যন্ত কম আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
(3) অর্থনৈতিক শোষণ: দরিদ্র নমঃশূদ্রদের ওপর জমিদার ও সরকারের তীব্র শোষণ চলত। সার্বিক দুর্দশা: অশিক্ষা, অচিকিৎসা, সামাজিক অমর্যাদা নমঃশূদ্রদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল।
[ii] আন্দোলনের পথে যাত্রা: নমঃশূদ্র সম্প্রদায় নিজেদের আর্থসামাজিক দুরবস্থা দূর করার উদ্দেশ্যে সামাজিক আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে বিভিন্ন সময় নেতৃত্ব দেন হরিচাদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর, রাজেন্দ্রনাথ মণ্ডল, মুকুন্দবিহারী মল্লিক, বিরাটচন্দ্র মন্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, প্রমথরঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ নমঃশূদ্র নেতা।
[iii] আন্দোলনের সূচনা: ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ অঞ্চলে ১৮৭২ - ৭৩ খ্রিস্টাব্দে একটি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নমঃশূদ্র আন্দোলনের সূচনা হয়। এখানে এক বিশিষ্ট নমঃশূদ্র নেতার মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে উচ্চবর্ণের লোকজন আসতে অস্বীকার করে। এরপর নমঃশূদ্ররা উচ্চবর্ণের সঙ্গে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তারা উঁচু জাতের কৃষিকাজ, ঘর ছাওয়া বা অন্যান্য কাজ করতে অস্বীকার করে।
[iv] মতুয়া ধর্মের প্রসার: নমঃশূদ্র নেতা শীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর অনুগামীদের মধ্যে মতুয়া নামে এক ধর্মীয় ভাবধারার প্রচার করে নমঃশূদ্রদের ধর্মীয় আদর্শে ঐক্যবদ্ধ করেন। মতুয়া ধমকে কেন্দ্র করে নমঃশূদ্র ঐক্যবদ্ধ করেন৷ মতুয়া ধর্মকে কেন্দ্র করে নমঃশূদ্র আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে। হরিচাদের পুত্র গুরুচাদ ঠাকুর নমঃশূদ্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দেন।
[v] চেতনার জাগরণ: হরির্চাদ ঠাকুর ও তার পুত্র গুরুচাদ ঠাকুর উপলদ্ধি করেন যে, নমঃশূদ্রদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার খুবই জরুরি। তাই তারা আন্দোলনের বার্তা গ্রামগঞ্জের নমঃশূদ্রদের মধ্যে প্রচার করেন। তারা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নমঃশূদ্রের যাত্রাগান, পালাগান, সাপ্তাহিক ‘মুষ্ঠি সংগ্রহ প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। এর ফলে নমঃশূদ্রদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
[v] নমঃশূদ্র সংগঠন: নমঃশূদ্র সংগঠনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘নমঃশূদ্র ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন', ‘উন্নয়নী সভা (১৯০২ খ্রি.), ‘বেঙগল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন (১৯১২ খ্রি.), ‘নিখিলবঙ নমঃশূদ্র সমিতি (১৯২৬ খ্রি.), ‘বেঙাল ডিপ্রেসড ক্লাসেস অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘বঙ্গীয় দলিত শ্রেণি সমিতি' (১৯২৬ খ্রি.) প্রভৃতি। এসব সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে নমঃশূদ্রদের সম্মেলনের আয়োজন হয়।
[vii] রাজনৈতিক দাবি: নমঃশূদ্ররা ক্রমে রাজনৈতিকভাবেও বিভিন্ন দাবিদাওয়া জানাতে থাকে। (1) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙকে তারা সমর্থন করে। (2) তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানায়।(3) লন্ডনে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৩০-৩২ খ্রি.) আইনসভায় বেশিসংখ্যক দলিত প্রতিনিধি গ্রহণের দাবি জানানো হয়।(4) আম্বেদকরের পৃথক নির্বাচনের দাবি এবং সরকারের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’ নীতিকে তারা সমর্থন করে।
উপসংহার: নমঃশূদ্রদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে বাংলার দলিতরা বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার লাভ করতে সক্ষম হয়। তবে দেশভাগের সময় নমঃশূদ্র নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল নমঃশূদ্রদের পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার আবেদন জানালেও শ্রীশ্রীহরিচাদ ঠাকরের উত্তরসুরি প্রমথরঞ্জন। ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশূদ্রদের একটি বড়ো অংশ মাতৃভূমি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর নমঃশূদ্ররা পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের শিকার হলে এবং পশ্চিমবঙ্গে নিঃস্ব-রিক্ত উদ্বাস্তু জীবনের সম্মুখীন হলে তাদের আন্দোলনে ভাটা পড়ে।
................

