📚উত্তরসহ উচ্চমাধ্যমিক বাংলা লাস্টমিনিট সাজেশন-২০২৫(প্রশ্নের মান-৫(১০০% কমন আসবেই আসবে)📚
Prepared by
KABIR SIR
👉বিভাগ-ক:
১. মৃত্যঞ্জয়ের বাড়ির অবস্থা শোচনীয়।-মৃত্যুঞ্জয় কে ? তার বাড়ির অবস্থা শোচনীয় কেন? ১+৪
উঃ 👉মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কে বাঁচায় কে বাঁচে’ গল্পের প্রধান চরিত্র হল মৃত্যুঞ্জয়। লেখকের কথায়, সে ছিল ‘মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে পচা ঐতিহ্য আদর্শবাদের কল্পনা-তাপস’।
👉মৃত্যুঞ্জয় তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। সে একটি অফিসে চাকরি করত। একদিন অফিস যাওয়ার পথে একটি অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল। তারপর থেকে তাঁর মনোজগতে এমন পরিবর্তন এসেছিল যে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের জন্য একবেলার খাবার বিলি করে দিত। তারপর মাইনের সমস্ত টাকাটা রিলিফ ফান্ডে দান করে দেয়। এরপর যত দিন যায় সেও ক্রমশ পাল্টে যেতে থাকে। অফিস থেকে আগেই বেরিয়ে যেত এবং সময়মতো বাড়িও ফিরত না। শহরের ফুটপাতে এবং বিভিন্ন লঙ্গরখানায় নিরন্ন মানুষের সঙ্গে সে সময় কাটাত।
দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মানুষদের মুখে অন্ন জোগানোর জন্য সে নিজের এবং পরিবারের প্রতি যে অবহেলা শুরু করেছিল, তারই পরিণতিতে তার বাড়ির অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। তার বাড়িতে তখন-
১) টুনুর মা অর্থাৎ মৃত্যুঞ্জয়ের স্ত্রী শয্যাশায়ী। তার স্বাস্থ্য ভালো ছিল না অথচ এতদিন ধরে নিজের খাবার অপরকে বিলি করে এসেছে। তার ফলেই এখন সে শয্যাশায়ী।
২) সে বাড়ির লোকেদের বারবার স্বামীর খোঁজে পাঠিয়ে দেয়। তারা কেউ মৃত্যুঞ্জয়ের খোঁজ পায় না। ফলে বাধ্য হয়ে বাড়িতে এসে তাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দেয়।
৩) মৃত্যুঞ্জয়ের ছেলেমেয়েগুলি অবহেলায়, অনাদরে, ক্ষুধার জ্বালায় চেঁচিয়ে কাঁদে।
এইভাবে, দেশের লোকের ভালো করার নেশায় মৃত্যুঞ্জয় যে পাগলামি শুরু করেছিল তার ফলেই তার বাড়ির অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছিল।
২. ‘শেষ রােদের আলোয় সে দূরের দিকে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল’- কার কথা বলা হয়েছে ? সে ‘ক্রমশ আবছা হয়ে গেল’ কেন ? ১+৪
উঃ 👉প্রশ্নোধৃত অংশে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের সেই বুড়ির কথা বলা হয়েছে যার মরদেহকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল।
👉‘ভারতবর্ষ’ গল্পের শেষ অংশে দেখা যায় যে বুড়ির মরদেহের উপর অধিকারের দাবিতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এমন সময় উপস্থিত জনতাকে আশ্চর্যচকিত করে বুড়ির মড়াটা নড়েচড়ে উঠে বসল। অনেকেই জানতে চেয়েছিল সে কোন ধর্মের। কিন্তু বুড়ি কারো কোনো প্রশ্নের সদুত্তর না দিয়ে নড়বড় করে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। উত্তেজিত জনতাকে পিছনে ফেলে বুড়ি শেষ রোদের আলোয় ‘দূরের দিকে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল’। বুড়ির এই ‘ক্রমশ আবছা হয়ে’ যাওয়ার আলাদা একটা তাৎপর্য রয়েছে।
‘ভারতবর্ষ’ গল্পের বুড়ি কোনো সাধারণ মানবী নয়, এই বুড়ি যেন মুর্তিময়ী ভারতজননী। বুড়ি সেই ভারতবর্ষের প্রতীক যে ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষভাবে বহু জাতিকে নিজের বুকে আশ্রয় দিয়েছে এবং যে ভারতবর্ষ ঐতিহাসিক কাল থেকে বহু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছে। উত্তেজিত জনতাকে পিছনে ফেলে বুড়ি এগিয়ে চলে, যেমনভাবে এর আগেও বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ভারতীয় সভ্যতা এগিয়ে গেছে। বুড়ি যত সামনের দিকে এগিয়ে চলে ততই সে জনতার চোখে ক্রমশ আবছা হয়ে যায়।
৩.“যা আর নেই, যা ঝড়-জল-মাতলার গর্ভে গেছে তাই খুঁজে খুঁজে উচ্ছব পাগল হয়েছিল।”-দুর্যোগটির বর্ণনা দাও। দুর্যোগটি উচ্ছবকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল? ৩+২
উঃ 👉মহাশ্বেতা দেবীর ‘ভাত’ গল্পে এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিচয় পাই যা উচ্ছবের জীবনটাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। গল্পের বিভিন্ন অংশে লেখিকা বিচ্ছিন্নভাবে সেই দুর্যোগের বর্ণনা দিয়েছেন।
সেদিন সন্ধ্যার থেকে ঝড়ের পূর্বাভাস বোঝা গিয়েছিল। তারপর রাত্রিবেলায় তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। ছেলেমেয়েগুলিকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছবের বউ ভয়ে এবং শীতে কাঁপছিল। আর উচ্ছব ঘরের মাঝ-খুঁটি ধরে মাটির দিকে চাপ দিচ্ছিল। ঘরের মূল অবলম্বন মাঝ-খুঁটিটা ঝড়ের দাপটে টলছিল। উচ্ছব ‘ভগমান! ভগমান!’ বলে ডাকছিল কিন্তু ঈশ্বরও সেদিন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। ঝড়ের আঘাতে মাতলা নদীর জল উথলে উঠেছিল আর তাদের গ্রাম ভাসিয়ে দিয়েছিল। জল-ঝড়ের যুগপৎ তান্ডবে উচ্ছবের সংসার মামলার গর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল।
👉এই দুর্যোগের পর স্বজন হারানোর শোকে উচ্ছব প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন ধরে সে ধ্বংসস্তুপ আগলে বসেছিল এবং নিজের স্ত্রী-পুত্রের নাম ধরে ডাকছিল। কিন্তু কারো সাড়া পায়নি। ওদিকে বন্যা উপলক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে গ্রামে লঙ্গরখানা বসেছিল। যতদিন সেখানে খাবার বিলি করা হচ্ছিল, ততদিন উচ্ছবের কোনো হুঁশ ছিল না। যখন সে পেটের খিদে নিয়ে সেখানে গেল তখন খিচুড়ি শেষ। সেদিন শুকনো চাল চিবিয়ে জল খেয়েছিল সে। ভাতের অভাবে উচ্ছব মানুষ থেকে প্রেতে পরিণত হয়েছিল। খিদের জ্বালায় সে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত পেটভরে দুটি খাবার আশায় সে বাসিনীর বোন আর ভাজের সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিল।
৪.“বুড়ির শরীর উজ্জ্বল রোদে তপ্ত বালিতে চিত হয়ে পড়ে রইল৷” -বুড়ির চেহারা ও পোশাকের পরিচয় দাও৷ তার তপ্ত বালিতে পড়ে থাকার কারণ কী? ২+৩
উঃ 👉সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের মুখ্য ভূমিকায় রয়েছে একটি বুড়ি। ‘পউষে বাদলার’ অকাল-দুর্যোগের দিনে এক সকালে সেই বুড়ির আবির্ভাব ঘটেছিল। লেখক সুন্দরভাবে সেই বুড়ির চেহারা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। সে ছিল এক থুত্থুড়ে কুঁজো বুড়ি যাকে দেখে ভিখিরি বলেই মনে হবে। তার রাক্ষুসে চেহারায় একমাথা সাদা চুল এবং মুখে দীর্ঘায়ুর ছাপ পড়েছে। তার পরনে ছিল একটি ছেঁড়া নোংরা কাপড় এবং গায়ে জড়ানো ছিল একটি চিটচিটে তুলোর কম্বল। এক হাতে বেঁটে লাঠি নিয়ে পিচের উপর হেঁটে হেঁটে হেটে এসে হাজির হয়েছিল চায়ের দোকানের সামনে।
👉এই বুড়ি ছিল বৃক্ষবাসিনী। বাজারের একটি বটগাছের খোন্দলে সে আশ্রয় নিয়েছিল। সময়টা ছিল শীতকাল, তার উপর একটানা কদিন ধরে বৃষ্টি পড়ছিল। সবাই ভেবেছিল এখানে থাকলে বুড়ি নির্ঘাত মারা যাবে। পরদিন সকালেই বাজারের লোকজন আবিষ্কার করল যে বুড়ি আর নড়ছে না- নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। সকলেই ধরে নিল বুড়ি মারা গেছে।
অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরটা থানায় দিয়ে এলেই ভালো হতো। কিন্তু চৌকিদারের পরামর্শে পাঁচ কোশ দূরে থানায় খবর না দিয়ে বুড়িকে ‘লদীতে’ ফেলে দিয়ে আসা হয়। কয়েকজন মিলে বাঁশের চ্যাংদোলায় ঝুলিয়ে বুড়িকে নদীর চড়ায় ফেলে এসেছিল। সেইজন্য উজ্জ্বল রোদে ‘তপ্ত বালিতে’ চিত হয়ে সে পড়েছিল।
৫. “ভুরিভোজনটা অন্যায়, কিন্তু না খেয়ে মরাটা উচিত নয় ভাই।” বক্তা কে? এই বক্তব্যের মধ্যে বক্তা চরিত্রের কোন দিকটি আভাসিত হয়েছে?
উঃ👉 মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কে বাঁচায় কে বাঁচে গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের সহকর্মী ও বন্ধু নিখিল এই কথা বলেছিল।
👉নিখিলের এই বক্তব্য থেকে তার চরিত্রের বাস্তববাদী দিকটি আভাসিত হয়েছে। মন্বন্তরের সময় বহুু মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিল। তখন অনাহারে মৃত্যুর ব্যাপারটা নিতান্তই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আদর্শবাদী মৃত্যুঞ্জয়ের পক্ষে না খেতে পেয়ে মৃত্যুর দৃশ্য সহ্য করা সহজসাধ্য ছিল না। সেইজন্য মাইনের দিন তার বেতনের সমস্ত টাকাটা সে নিখিলের হাতে তুলে দিয়েছিল এবং বলেছিল কোনো রিলিফ ফান্ডে সেটা দিয়ে দিতে। অর্থাৎ, অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে মেরে ফেলার আয়োজন করেছিল সে। নিখিল তাকে এই বাস্তব ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে এইভাবে দেশের লোককে বাঁচানো যাবে না।
প্রতিটি মানুষেরই বেঁচে থাকার জন্য খাবারের প্রয়োজন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষগুলোকে বাঁচাতে হলে যেমন খাবারের প্রয়োজন, তেমনি মৃত্যুঞ্জয়ের নিজের বেঁচে থাকার জন্যও খাবার প্রয়োজন। দুর্ভিক্ষের সময় ভুরিভোজন করাটা উচিত নয়, সেটা কাম্যও নয়। কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেটুকু খাবার দরকার সেটুকু খেতেই হবে। উপায় থাকতেও নিজেকে না খাইয়ে মারা অন্যায়। আদর্শবাদী মৃত্যুঞ্জয়ের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিখিলের এই বাস্তববোধ চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
৬. ‘সে বুঝতে পারে সব ভাত ওরা পথে ফেলে দিতে যাচ্ছে।’- ‘ওরা’ বলতে কাদের বােঝানাে হয়েছে? ওরা সব ভাত ফেলে দিতে যাচ্ছিল কেন? ‘সে’ কে ? বুঝতে পেরে সে কী করেছিল? ১+১+১+২
উঃ 👉মহাশ্বেতা দেবীর ‘ভাত’ গল্পের উদ্ধৃত অংশে ‘ওরা’ বলতে বাসিনীর মনিব বাড়ির লোকেদের কথা বলা হয়েছে।
👉ওরা সব ভাত ফেলে দিতে যাচ্ছিল কারণ অশৌচ বাড়ির ভাত খাওয়া চলে না, ফেলে দেওয়াটাই নিয়ম।
👉আলোচ্য অংশে ‘সে’ বলতে উচ্ছবকে বোঝানো হয়েছে।
👉বড়ো পিসিমার নির্দেশে বাসিনী অশৌচ বাড়ির ভাত-তরকারি সব ফেলে দিতে যাচ্ছিল। উচ্ছব তখন কাছেই ছিল, তাই বাসিনী তাকে সাহায্য করতে বলে। উচ্ছব নিজে থেকেই বলে সে বড় ডেকচিটা নেবে, অর্থাৎ, যেটাতে মোটা চালের ভাত ছিল। ভাতগুলি অনেক দূরে ফেলে দিয়ে আসার জন্য সে বাড়ি থেকে বেরোয়। প্রথমে সে হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে, তারপর ছুট দেয়।
দীর্ঘদিন ধরে অভুক্ত থাকা উচ্ছব, ভাতের অভাবে যে মানুষ থেকে প্রেত হয়ে গিয়েছিল, তার কাছে এসব লোকাচার মূল্যহীন। সে থাকতে ওই ভাত কাক-কুকুরে খাবে, সেটা কি হতে পারে? সে নিজেই তো বাদার ভাতের স্বাদ নিতে চায়- ভাত খেয়ে প্রেত থেকে আবার মানুষ হতে চায়। তাই বাসিনীর বাধা না মেনে সে ভাতের ডেকচি নিয়ে দৌড়তে থাকে। স্টেশনে গিয়ে সে মনের সুখে সেই ভাতগুলি খেয়েছিল।
৭. ‘এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কী ?- কে, কোন অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের কথা বলেছেন? বক্তা নিজেকে অপরাধী মনে করেছেন কেন? ১+২+২
উঃ 👉মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কে বাঁচায় কে বাঁচে’ গল্পে মৃত্যুঞ্জয় তার নিজের অপরাধের কথা বলেছে।
👉মৃত্যুঞ্জয় এক বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজেকে অপরাধী বলে মনে করেছে। অবশ্য অন্য কেউ তাকে অপরাধী আখ্যা দেয়নি, এটি তার আত্মসমালোচনা।
👉তার অপরাধটা এইরকম- “কে বাঁচায় কে বাঁচে” গল্পটি পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই বাংলার বুকে এক ভয়াবহ দুর্যোগের ছায়া দেখা দিয়েছিল। সেই দুর্যোগের নাম পঞ্চাশের মন্বন্তর। কালোবাজারির বাড়বাড়ন্তের ফলে এবং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের উদাসীনতায় এই দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছিল। সেই সময় গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ সামান্য খাবারের আশায় শহরে এসে হাজির হয়েছিল। সেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের তুলনায় লঙ্গরখানার সংখ্যা নেহাতই কম ছিল। আবার, পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের অভাবে ত্রাণকার্যও ব্যাহত হচ্ছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, শহরের আনাচে-কানাচে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। সেদিন খাবারের অভাবে শহরের বুকে মৃত্যুমিছিল নেমে এসেছিল। মৃত্যুঞ্জয়ের মতে, এইরূপ সংকটময় পরিস্থিতিতে নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করাই হলো অপরাধ। মৃত্যুঞ্জয় একজন আদর্শবান মানুষ। দুর্ভিক্ষের কথা সে জানতো, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষজনের দুর্দশার কথাও সে জানতো। কিন্তু সব জেনেশুনেও এতকাল সে চারবেলা ভরপেট খেয়েছে এবং লোকের অভাবে যথেষ্ট রিলিফ ওয়ার্ক হচ্ছে না জেনেও নিজে অলসভাবে দিন যাপন করেছে। এইজন্য ফুটপাতে অনাহারে মৃত্যুর একটি ঘটনা দেখার পর সে নিজেকে অপরাধী বলে মনে করেছিল।
👉বিভাগ-খ:
১. ‘সে কখনও করে না বঞ্চনা’–কে, কখনও বঞ্চনা করে না? কবি কীভাবে সেই ভাবনায় উপনীত হয়েছেন ? ১+৪
উঃ 👉রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘রূপনারানের কূলে’ কবিতায় কবি বলেছেন যে, সত্য কখনো বঞ্চনা করে না।
👉জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে কবি যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, আলোচ্য কবিতায় সেই বিশেষ চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে কবি আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করতে পেরেছেন। সেই সূত্র ধরেই তিনি সত্যের অপার মহিমা অনুধাবন করেছেন। কবির এই সত্যোপলব্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
সত্য সম্পর্কে কবি বলেছেন, “সত্য যে কঠিন”। তবে, কাঠিন্য সত্বেও কবি জীবনে চলার পথে সত্যকেই গ্রহণ করেছেন এবং ভালো বসেছেন। কবির ভাষায় “কঠিনেরে ভালোবাসিলাম”।
নিজের দীর্ঘ জীবন-অভিজ্ঞতা থেকে কবি জেনেছেন যে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে সত্যের পথ অবলম্বন করাই শ্রেয়। কারণ, মিথ্যা মানেই বঞ্চনা। মিথ্যার পথ অবলম্বন করে সাময়িক সান্ত্বনা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সত্যের পথ রোধ করা যায়না। সত্য হল অনিবার্য। মানুষ যতই সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুক, সত্যের প্রকাশ একদিন হবেই। আবার, মিথ্যার পথ অবলম্বন করলে একসময় বঞ্চনার শিকার হতে হয়। অপরপক্ষে, সত্য কখনো মানুষকে বঞ্চনা করে না। সেইজন্য মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে প্রথম থেকেই কবি সত্যের প্রতি আস্থা রেখেছেন।
২.‘ঘুমহীন তাদের চোখে হানা দেয়/ কিসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন।” – কাদের কথা বলা হয়েছে? তাদের ঘুমহীন চোখে ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন হানা দেয় কেন ?
উঃ👉 প্রশ্নোদ্ধৃত অংশে কবি সমর সেন রচিত ‘মহুয়ার দেশ’ কবিতায় কবিকল্পিত মহুয়ার দেশের মানুষদের কথা বলা হয়েছে।
👉নাগরিক জীবনের ক্লান্তি দূর করার জন্যই কবি একসময় মহুয়ার দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে, কবির স্বপ্নের মহুয়ার দেশও আর নিষ্কলুষ নেই। হরিণ যেমন তার মাংসের জন্যই জগতের শত্রু, মহুয়ার দেশের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। সেখানে মাটির নিচে কয়লার বিশাল ভান্ডার লুকিয়ে ছিল। সেই কয়লা উত্তোলনের জন্য যন্ত্রসভ্যতা তাকে গ্রাস করে। এরফলে, একদিকে যেমন সেখানকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট হয়, তেমনই সেখানকার সাধারণ মানুষ তাদের সহজাত সরলতা ভুলে যন্ত্রসভ্যতার দাসে পরিণত হয়।
প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায় লালিত মহুয়ার দেশের সহজ সরল মানুষগুলি তাদের স্বাভাবিক জীবনধারা হারিয়ে ফেলেছে। এটা তাদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। বর্তমানে তারা কয়লাখনির শ্রমিক। সারারাত ধরে কয়লা খনন করার ফলে তারা বিনিদ্র রাত্রিযাপন করে এবং তাদের ঘুমহীন চোখে হানা দেয় ‘ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন’।
৩. “রূপ-নারানের কূলে/জেগে উঠিলাম” -কে জেগে উঠলেন? জেগে ওঠার আসল অর্থ কবিতাটির মধ্যে কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা বুঝিয়ে দাও ৷ ১+৪
উঃ 👉রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রূপনারানের কূলে’ কবিতাটি কবিজীবনের অন্তিম লগ্নে লিখিত দার্শনিক ভাবসমৃদ্ধ একটি কবিতা। রবীন্দ্রদর্শন অনুযায়ী, রূপ হল দৃশ্যমান এই জগৎ; অন্যভাবে বললে, জগতের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল বস্তুই হল রূপ। এই কবিতায় কবি ‘রূপনারান’ বলতে দৃশ্যমান তথা ইন্দ্রিয়গোচর জগতসংসারকে বুঝিয়েছেন।
রূপনারানের কূলে
👉কবিতার শুরুতেই কবি বলেছেন “রূপনারানের কূলে জেগে উঠিলাম”। সাধারণভাবে এই কথাটির অর্থ হল, রূপনারান নদীবক্ষে ভ্রমণ করার সময় কবি নিদ্রিত ছিলেন এবং কূলের কাছাকাছি এসে কবির নিদ্রাভঙ্গ ঘটল। কিন্তু এই আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি পঙক্তিটির একটি অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে। ‘রূপনারান’ এখানে কোন নদী নয় বরং দৃশ্যমান এই পৃথিবীকে কবি ‘রূপনারান’ বলেছেন। কিন্তু সরাসরি কোন নদীর কথা না বললেও কথাটির মধ্যে নদীর নির্যাস রয়েছে আর সেখানেই কথাটির তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে।
কবি-সাহিত্যিকগণ প্রায়শই সময়ের ধারাকে বহতা নদীর সাথে তুলনা করে থাকেন। আলোচ্য অংশে সময়ের স্রোতে জীবনের পথচলাই হল রূপনারানের বক্ষে কবির ভ্রমণ। আবার জীবন স্বভাবতই মোহময় হয় কিন্তু জীবনের শেষপ্রান্তে মানুষের মোহমুক্তি ঘটে। “রূপনারানের কুলে জেগে ওঠা” বলতে কবি ইঙ্গিত করেছেন জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত হয়ে পার্থিব জগতের মোহমুক্তি এবং আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ।
৪.“আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া-ফুল,/ নামুক মহুয়ার গন্ধ।”- ‘আমার’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? এমন কামনার কারণ কী? ১+৪
উঃ 👉কবি সমর সেনের লেখা ‘মহুয়ার দেশ’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত পংক্তিটিতে ‘আমার’ বলতে কবির নিজের কথা বলা হয়েছে।
👉এইরূপ কামনার কারণঃ
ক্লান্তি থেকে মুক্তিঃ কবি সমর সেন হলেন নাগরিক কবি। আলোচ্য কবিতার শুরুতেও নগর জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। সেখানে অস্তগামী সূর্য ‘গলিত সোনার মতো উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ’ এঁকে দেয়। আবার, একইসঙ্গে জলের ভেতরে ধূসর ফেনায় আগুন জ্বলে ওঠে। এই ধূসর-ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কবি এইরূপ কামনা করেছেন।
প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতাঃ নগর সভ্যতার প্রাণহীন নিস্তব্ধতা কবিকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি এই একঘেয়েমি জীবনযাপন থেকে মুক্তি পেতে চান। দিগন্ত-বিস্তৃত প্রকৃতির কোলে মাথা রেখে কবি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে চান।
কলুষতা থেকে মুক্তিঃ নগর হল যন্ত্রসভ্যতার প্রতীক। সেখানে কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ‘শীতের দুঃস্বপ্নের মতো ঘুরে ফিরে ঘরে আসে’। এই কলুষতা থেকে মুক্তি পেতেই কবি মহুয়া ফুলের স্পর্শ আর মহুয়ার ঘ্রাণ পেতে চেয়েছেন।
৫.‘এসেছে সে ভােরের আলােয় নেমে’ – সেই ভােরের বর্ণনা দাও। ‘সে’ ভােরের আলােয় নেমে আসার পর কী কী ঘটল, লেখাে। ৩+২
উঃ👉 জীবনানন্দ দাশের ‘শিকার’ কবিতায় একটি সুন্দর বাদামি হরিণ ভোরের আলোয় নেমে এসেছিল। সে সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল।
ভোরের আলোয় নেমে এসে সেই হরিণটি প্রথমে কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাস খেতে শুরু করে। তারপর অনিদ্রাজনিত ক্লান্তি দূর করার জন্য সে নদীর তীক্ষ্ণ-শীতল ঢেউয়ে নামে। নিজের দেহমনে ‘ভোরের রৌদ্রের মতো একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য’ সে হিমশীতল জলে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল।
আর সে এতকিছু করেছিল ‘সাহসে সাধে সৌন্দর্যে হরিণীর প্রহরীকে চমক লাগিয়ে দেওয়ার জন্য’। কিন্তু হরিণের ইচ্ছে পূরণ হয়নি। চোরা শিকারিদের অব্যর্থ নিশানায় হরিণটির স্বপ্নে ইতি টানা যায়।
👉‘একটা অদ্ভুত শব্দ’ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে নদীর জল মচকা ফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে যায়। জ্যান্ত হরিণ ততক্ষণে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়ে গেছে। আগুন জ্বালানো হয় এবং ‘উষ্ণ লাল হরিণের মাংস’ প্রস্তুত হয়। আর এইভাবে, একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ভোরের আলোয় নেমে এসে সুন্দর বাদামি হরিণটি মানুষের লালসার শিকার হয়েছিল।
৬. ‘অবসন্ন মানুষের শরীরে দেখি ধুলাের কলঙ্ক’ – এখানে কোন্ মানুষদের কথা বলা হয়েছে ? তারা অবসন্ন কেন ? ‘ধুলাের কলঙ্ক’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন। ১+২ +২
উঃ 👉নাগরিক কবি সমর সেনের লেখা ‘মহুয়ার দেশ’ কবিতার উদ্ধৃত অংশে যে মানুষদের কথা বলা হয়েছে তারা হল মহুয়ার দেশের সাধারণ মানুষ। প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায় লালিত এইসব মানুষদের শরীরে কবি ‘ধুলোর কলঙ্ক’ লক্ষ্য করেছেন।
👉নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কবি মহুয়ার দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেবদারুর ছায়ায় আবৃত মহুয়ার দেশে গিয়ে কবি নিষ্কলুষ প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সন্তান বলে পরিচিত সেখানকার সাধারণ মানুষের সান্নিধ্য লাভ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে কবি প্রত্যক্ষ করেন যে, সেখানকার মানুষজন শ্রান্ত, অবসন্ন। আসলে, কবির অজান্তেই, মহুয়ার দেশেও থাবা বসিয়েছিল যন্ত্রসভ্যতা এবং সহজ সরল মানুষগুলি যন্ত্রসভ্যতার দাসে পরিণত হয়েছিল। সারারাত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলেই তারা অবসন্ন হয়েছিল।
👉মহুয়ার দেশ একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন্ডিত এবং তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদেও পরিপূর্ণ। সেখানে মাটির নিচে রয়েছে কয়লার বিশাল ভান্ডার। আর, মহুয়ার দেশের মানুষগুলো এখন কয়লা খনির শ্রমিক। কয়লা খননের কাজে যুক্ত থাকার ফলেই তাদের শরীরে আজ ধুলোর কলঙ্ক। তবে, এই ‘ধুলোর কলঙ্ক’ নিছকই ধুলোর কালিমা নয়। কবি যে কলুষতা থেকে বাঁচবার জন্য মহুয়ার দেশে যেতে চেয়েছিলেন, ধুলোর কলঙ্ক বলতে কবি যন্ত্রসভ্যতার সেই কলুষতাকেই বুঝিয়েছেন।
👉বিভাগ-গ:
১. ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির নামকরণের তাৎপর্য আলোচনা করো ৷ ১+৪
উঃ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি অনবদ্য একাঙ্ক নাটক ‘নানা রঙের দিন’। নাটকের শুরুতেই নাট্যকার স্বল্পকথায় মঞ্চসজ্জার বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে- একটি পেশাদারি থিয়েটারের ফাঁকা মঞ্চ, পিছনের দেওয়ালে তখনো রাত্রে অভিনীত নাটকের দৃশ্যপট এবং চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল নাটকে ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও যন্ত্রপাতি। মঞ্চের মাঝখানে একটি টুল ওল্টানো ছিল। মঞ্চ তখনো অন্ধকার ছিল, অর্থাৎ কোনো আলো জ্বলছিল না।
আলোচ্য নাটকের প্রধান চরিত্র বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। নাটকের অপর চরিত্র কালীনাথের সঙ্গে কথোপকথন প্রসঙ্গেই উঠে আসে রজনীবাবুর ফেলে আসা জীবনের নানা কথা। নানা বর্ণে চিত্রিত তার জীবনের ইতিকথাই এই নাটকের প্রধান বিষয়।
রাঢ়বঙ্গের এক বনেদি ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান রজনীবাবু প্রথম জীবনে পুলিশ ছিলেন। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে থিয়েটার জগতে নিয়ে এসেছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নাট্যজগতে প্ৰতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। যুবা অভিনেতা রজনীকান্তের এই সব দিনগুলি ছিল রঙিন দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
তার অভিনয় দেখেই একটি মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল, যদিও সেই প্রেম বিয়ে পর্যন্ত এগোয়নি। রজনীবাবুর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেইসব বিবর্ণ দিনের কথাগুলি।
এরপর তার বয়স বাড়তে থাকে। তিনি মূল চরিত্র ছেড়ে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর অভিনয় জগতে থেকে একসময় তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। এইভাবে, আলোচ্য নাটকে রজনীবাবুর জীবনের নানা রঙের দিনগুলিই নাট্যরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তাই এই নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক হয়েছে।
২. ‘নানা রঙের দিন’ নাটক হিসেবে কতখানি সার্থক আলোচনা করো ৷ ৫
উঃ নাট্যসাহিত্যের আধুনিকতম প্রকরণ হল একাঙ্ক নাটক। সাধারণত স্বল্প আয়তন, একক কাহিনিযুক্ত নাটককে একাঙ্ক নাটক বলা যেতে পারে। অবশ্য একাঙ্ক নাটকের আরো অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এইসব বৈশিষ্ট্যের নিরিখে আমাদের পাঠ্য ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটি একাঙ্ক নাটক হিসেবে কতখানি সার্থক তা আলোচনা করা হল।
প্রথমত, ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটি এক অঙ্কের স্বল্পায়তন নাটক। এই পরিমিত আয়তন একাঙ্ক নাটকের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, এই নাটকের প্রধান বিষয় হল প্রাক্তন অভিনেতা রজনী চাটুজ্জ্যের স্মৃতিচারণা। সেই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে তার ব্যক্তিজীবন ও শিল্পী জীবনের নানা কথা। অর্থাৎ, এই নাটকে একাঙ্ক নাটকের ভাবগত ঐক্য রক্ষিত হয়েছে।
তৃতীয়ত, একাঙ্ক নাটকের একদম প্রথম সংলাপ থেকে নাট্যকাহিনির সূচনা হয়। এই নাটকেও তেমনটাই দেখা যায়।
চতুর্থত, এই নাটকের মাত্র দুটি চরিত্র এবং উপকাহিনি-বর্জিত একটি মূল কাহিনি- অর্থাৎ, সব দিক থেকেই বাহুল্যবর্জিত। এটিও একাঙ্ক নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পঞ্চমত, আলোচ্য নাটকে অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের একাকীত্ব, ভয় এবং হতাশা থেকে কালীনাথের কাছে স্মৃতিচারণা এবং সবশেষে বাস্তবোপলব্ধি- নাট্যকাহিনি দ্রুততার সঙ্গে পরিণতির দিকে এগিয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যটিও একাঙ্ক নাটকের বৈশিষ্ট্য।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, এই নাটকে রজনীকান্তের দীর্ঘ সংলাপ একাঙ্কিকার স্বভাব-বিরুদ্ধ। তা সত্বেও পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্যের নিরিখে ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটিকে একটি সার্থক একাঙ্ক নাটক বলা যেতে পারে।
৩. “… প্রাক্তন অভিনেতা রজনী চাটুজ্জের প্রতিভার অপমৃত্যুর করুন সংবাদ!”- কে বলেছেন? এই অপমৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল বলে বক্তা মনে করেন? ১+৪
উঃ 👉অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে পেশাদারি থিয়েটারের প্রাক্তন অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নিজেই একথা বলেছেন।
👉রজনীবাবু একজন প্রতিভাবান অভিনেতা ছিলেন। অভিনয়কে ভালোবেসে পুলিশের চাকরি ছেড়ে তিনি থিয়েটারে ঢুকেছিলেন। অভিনেতা হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয়ও ছিলেন। যখন তার বয়স কম ছিল তখন যেকোনো চরিত্র তিনি অনায়াসে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন এবং তার অভিনয়-স্পর্শে প্রতিটি চরিত্র নতুন আঙ্গিকে প্রকাশ পেত। এভাবেই চলে যাচ্ছিল।
এমন সময় তার জীবনে একটি মেয়ের আবির্ভাব ঘটে। জনৈক বড়লোকের সুন্দরী মেয়ে রজনীবাবুর অভিনয় দেখে তার প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই সে বলেছিল “তুমি ওই থিয়েটার করা ছেড়ে দাও”। রজনীবাবু মেয়েটির শর্তে রাজি হননি এবং অভিনয় করাও ছাড়েন নি, বরং এরপর থেকে থিয়েটারকেই বেশি করে আঁকড়ে ধরেছেন।
থিয়েটারকে নিজের জীবনের ধ্রুবতারা করে, অভিনয় জগতে পঁয়তাল্লিশ বছর পথচলার পর তিনি বুঝতে পারেন, বার্ধক্য তাকে গ্রাস করেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলার কাজ নষ্ট হয়ে গেল, অভিনয়-দক্ষতাও কমে গেল। এতদিন তিনি নিজেকে নিয়ে ভাববার অবসর পাননি, যখন পিছন ফিরে দেখলেন তখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। যে রজনীকান্তের ‘ট্যালেন্ট’ নিয়ে গুণীজন প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, বয়সের ভারেই সেই ‘প্রতিভার অপমৃত্যু’ ঘটেছিল।
৪. ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের সূচনায় মঞ্চসজ্জার যে বর্ণনা আছে, তা নিজের ভাষায় লেখাে।
উঃ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি অনবদ্য একাঙ্ক নাটক ‘নানা রঙের দিন’। নাটকের শুরুতেই নাট্যকার স্বল্পকথায় মঞ্চসজ্জার বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে- একটি পেশাদারি থিয়েটারের ফাঁকা মঞ্চ, পিছনের দেওয়ালে তখনো রাত্রে অভিনীত নাটকের দৃশ্যপট এবং চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল নাটকে ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও যন্ত্রপাতি। মঞ্চের মাঝখানে একটি টুল ওল্টানো ছিল। মঞ্চ তখনো অন্ধকার ছিল, অর্থাৎ কোনো আলো জ্বলছিল না।
আলোচ্য নাটকের প্রধান চরিত্র বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। নাটকের অপর চরিত্র কালীনাথের সঙ্গে কথোপকথন প্রসঙ্গেই উঠে আসে রজনীবাবুর ফেলে আসা জীবনের নানা কথা। নানা বর্ণে চিত্রিত তার জীবনের ইতিকথাই এই নাটকের প্রধান বিষয়।
রাঢ়বঙ্গের এক বনেদি ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান রজনীবাবু প্রথম জীবনে পুলিশ ছিলেন। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে থিয়েটার জগতে নিয়ে এসেছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নাট্যজগতে প্ৰতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। যুবা অভিনেতা রজনীকান্তের এই সব দিনগুলি ছিল রঙিন দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
তার অভিনয় দেখেই একটি মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল, যদিও সেই প্রেম বিয়ে পর্যন্ত এগোয়নি। রজনীবাবুর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেইসব বিবর্ণ দিনের কথাগুলি।
এরপর তার বয়স বাড়তে থাকে। তিনি মূল চরিত্র ছেড়ে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর অভিনয় জগতে থেকে একসময় তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। এইভাবে, আলোচ্য নাটকে রজনীবাবুর জীবনের নানা রঙের দিনগুলিই নাট্যরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তাই এই নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক হয়েছে।
৫. “অভিনেতা মানে একটা চাকর–একটা জোকার, একটা ক্লাউন৷ লোকেরা সারাদিন খেটেখুটে এলে তাদের আনন্দ দেওয়াই হল নাটক-ওয়ালাদের একমাত্র কর্তব্য।”- বক্তার কথার তাৎপর্য আলোচনা করো ৷ ৫
উঃ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের প্রধান চরিত্র পেশাদারী থিয়েটারের প্রাক্তন অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। থিয়েটারের সাধারণ দর্শক অর্থাৎ টিকিটকেনা খদ্দেরদের প্রতি তাঁর মনোভাব বিরূপ। রজনীবাবুর মতে, এই সমস্ত দর্শকদের চোখে “অভিনেতা মানে একটা চাকর- একটা জোকার, একটা ক্লাউন”। রজনীবাবুর এই মনোভাব আলোচ্য নাটকের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
যখন তাঁর বয়স কম ছিল, একটি মেয়ে এসেছিল তাঁর জীবনে। তাঁর অভিনয় দেখে মেয়েটি নিজে থেকেই এসে আলাপ করেছিল। আলাপ থেকেই ঘনিষ্ঠতা এবং তারপর প্রেম। মেয়েটির সপর্কে রজনীবাবু যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। তিনি নিজের মতো করে অনেক স্বপ্ন সাজিয়েছিলেন তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে।
তারপর একদিন যখন বিয়ের প্রসঙ্গ এল, মেয়েটি তাঁর সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। মেয়েটি রজনীবাবুকে বিয়ে করতে রাজী ছিল কিন্তু তাঁর শর্ত ছিল- “তার আগে তুমি ওই থিয়েটার করা ছেড়ে দাও”। থিয়েটারের লোকের সঙ্গে মেয়েটি প্রেম করতে পেরেছিল কিন্তু তাঁকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। এই করুণ জীবন-অভিজ্ঞতা রজনীবাবুর জীবন-দর্শন পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।
এই কারণেই থিয়েটারের টিকিটকেনা খদ্দের বা দর্শক সপর্কে অভিনেতা রজনীবাবুর এইরূপ মনোভাব। তারা থিয়েটারের লোকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করে, চা-টা খাওয়ায়, কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনোরকম সামাজিক সম্পর্ক স্বীকার করেনা। থিয়েটারের অভিনেতার সঙ্গে কেউ নিজের বোন বা মেয়ের বিয়েও দেবেনা বলে রজনীবাবু মনে করেন।
তিনি নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা দিয়ে এই শিক্ষা পেয়েছেন যে, যতক্ষণ অভিনেতারা স্টেজে থাকেন ততক্ষণ কদর। তারপর যে যার ঘরে ফিরে যায়, তাদের কথা কেউ মনেও রাখে না।
👉বিভাগ-ঘ:
১. “…সেই সন্ধ্যায় কোথায় গেল রাজমিস্ত্রিরা ?”–রাজমিস্ত্রিরা কী নির্মাণ করেছিল? এই প্রশ্নের মাধ্যমে বক্তা কী বলতে চেয়েছেন? ১+৪
উঃ 👉বের্টোল্ট ব্রেখটের ‘পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন’ কবিতা থেকে নেওয়া উদ্ধৃত অংশে চীনের প্রাচীর নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। রাজমিস্ত্রিরা চীনের প্রাচীর নির্মাণ করেছিল।
👉আধুনিক বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি হল চীনের প্রাচীর। বিদেশি আক্রমন প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে এই প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। ইতিহাস বই থেকে আমরা জানতে পারি যে, প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে এবং নির্মাণকার্য শেষ হয়েছিল সপ্তদশ শতকে, মিং শাসকদের আমলে। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি স্থাপত্য।
কিন্তু কবি প্রশ্ন করেছেন- “চীনের প্রাচীর যখন শেষ হল/ সেই সন্ধ্যায় কোথায় গেল রাজমিস্ত্রিরা?” অর্থাৎ, কবি কিন্তু কোনো রাজাকে চীনের প্রাচীর নির্মাণের কৃতিত্ব দেননি, তিনি কৃতিত্ব দিয়েছেন রাজমিস্ত্রিদের।
চীনের প্রাচীর বহু শতাব্দি ধরে নির্মিত হয়েছিল। এই স্থাপত্যটি নির্মাণের ব্যাপারে চীনা রাজাদের অবশ্য একটা অবদান ছিল, সেটা হল অর্থের জোগান দেওয়া। যদিও এই অর্থ প্রজাদের কাছ থেকেই আসত, রাজস্ব হিসেবে জমা হত রাজকোষে। যাইহোক, প্রকৃত বিচারে চীনের প্রাচীর হল শত সহস্র শ্রমিক এবং রাজমিস্ত্রির মেহনতের ফল।
২. “বইয়ে লেখে রাজার নাম রাজারা কি পাথর ঘাড়ে করে আনত?” -কারা, কেন পাথর ঘাড়ে করে এনেছিল? ১+৪
উঃ 👉বের্টোল্ট ব্রেখটের ‘পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন’ কবিতার প্রথমেই কবি প্রশ্ন করেছেন “কে বানিয়েছিল সাত দরজাঅলা থিবস্?” কবি নিজেই উত্তর দিয়েছেন যে, ইতিহাস বইয়ে লেখা আছে রাজার নাম। তারপরেই কবি আরো প্রশ্ন করেছেন, “রাজারা কি পাথর ঘাড়ে করে আনত?” কবির এই প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
👉প্রাচীন মিশরীয় নগরী থিবস্ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রাচীন মিশরের রাজধানি ছিল। পরবর্তীকালে এই নগরী মিশরের প্রধান ধর্মীয় নগরী হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া, সাত দরজাওয়ালা থিবস নগরীর স্থাপত্য এখনকার মানুষকেও আকৃষ্ট করে। এইজন্য কবি জানতে চেয়েছেন, থিবস নগরীর প্রতিষ্ঠার পিছনে কাদের অবদান ছিল? ইতিহাস বই ঘেঁটে কবি রাজার নাম পেয়েছেন। কিন্তু সেই তথ্য কবির কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। কারণ, যেকোনো স্থাপত্য গড়ে তুলতে হলে পাথর বয়ে আনতে হয়। ইতিহাস বই থেকে আমরা জানতে পারি যে রাজারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করত। সুতরাং তারা কীভাবে ঘাড়ে করে পাথর বয়ে আনতে পারে?
শুধু থিবস নগরী নয়, বিশ্বের যেকোনো স্থাপত্যের প্রধান কারিগর সাধারণ মানুষ। শত শত মজুর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একেকটি স্থাপত্য নির্মাণ করতো। অথচ, ইতিহাস বইয়ে এইসব স্থাপত্যের স্রষ্টা হিসেবে কেবল রাজার নাম লেখা আছে। কবি বলতে চেয়েছেন যে, রাজারা ঘাড়ে করে পাথর বয়ে আনত না, সাধারণ মানুষই নিয়ে আসত।
৩. “ভারত জয় করেছিল তরুণ আলেকজান্ডার/ একলাই না কি?”- আলেকজান্ডার কে ছিলেন? ‘একলাই না কি’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? ১+৪
উঃ 👉বের্টোল্ট ব্রেখটের ‘পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন’ কবিতায় উল্লেখিত আলেকজান্ডার ছিলেন ম্যাসিডনের রাজা।
👉আলোচ্য কবিতায় গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে – ‘ভারত জয় করেছিল তরুণ আলেকজান্ডার।’ সঙ্গে সঙ্গে কবির প্রশ্ন ‘একলাই নাকি?’ আলোচ্য কবিতার প্রেক্ষিতে কবির এই প্রশ্নটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
ইতিহাস অনুসারে, আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং মহারাজ পুরু সহ অন্যন্য কতিপয় রাজন্যবর্গকে পরাভূত করে ভারত জয় করেছিলেন। কিন্তু কবি জানতে চেয়েছেন যে, আলেকজান্ডার কি একাই ভারত আক্রমণ করেছিলেন? আর কেউ কি তার সঙ্গে ছিল না?
যত বড়ই রাজা হোক, একার পক্ষে কি কোনো যুদ্ধ জয় করা আদৌ সম্ভব? যুদ্ধ তো করে সাধারণ সৈন্যরা। আর, সৈন্যদের পরিচালনা করে সেনাপতিরা। একথা ঠিক যে, রাজারা সাধারণত বড় যোদ্ধাই হতেন। কিন্তু, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের বিশেষ ভূমিকা থাকত না। কোনো রাজকেই প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হত না। রাজারা কেবল যুদ্ধ ঘোষণা বা সন্ধি স্বাক্ষর করতেন। অথচ, ইতিহাসের এমনই পরিহাস যে প্রতিটি যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব কেবল রাজকেই দেওয়া হয়েছে। কখনো হয়তো বা কোনো সেনাপতি সেই কৃতিত্বের ছিটেফোঁটা পেয়ে গেছে কিন্তু কোনো ইতিহাস বইয়ে সাধারণ সেনাদের কথা স্থান পায়নি।
কবির মতে, আলেকজান্ডারও একা ভারত জয় করেন নি। তার সঙ্গেও অনেক বীর সৈন্য এবং দক্ষ সেনাপতি ছিল। ‘একলাই না কি’?- এই প্রশ্নের মাধ্যমে কবি সেইসব সাধারণ সৈন্যদের অবদানকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
৪. ‘স্পেনের ফিলিপ কেঁদেছিল খুব। আর কেউ কাঁদেনি?” উদ্ধৃতাংশটি যে কবিতার অন্তর্গত, সেই কবিতায় আর কোন্ কোন্ শাসকের নাম আছে? ফিলিপ কেঁদেছিলেন কেন? “আর কেউ কাদেনি?”- বলতে বক্তা কী বােঝাতে চেয়েছেন? ২ + ১ + ২
উঃ 👉বের্টোল্ট ব্রেখটের ‘পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন’ কবিতায় স্পেনের রাজা ফিলিপ ছাড়া আর যেসব শাসকের নাম উল্লেখ রয়েছে তারা হলেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার, ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডার এবং দ্বিতীয় ফ্রেডরিক।
👉ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্পেনের রাজা ফিলিপের নৌবহর ‘স্প্যানিশ আর্মাডা’র শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল। এইজন্য তিনি কেঁদেছিলেন।
👉ইতিহাসের পাতায় পাতায় কেবল যুদ্ধের কাহিনি। ঐতিহাসিকরা বিজয়ী রাজার বিজয়োল্লাসের কথা যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি পরাজিত রাজার মনোবেদনা লিপিবদ্ধ করতে কার্পণ্য করেননি। মোটকথা হল, ইতিহাস আর রাজকাহিনি সমার্থক হয়ে উঠেছে। প্রচলিত ইতিহাসে সাধারণ মানুষের উল্লেখ নেই বললেই চলে। অথচ, যেকোনো যুদ্ধে সামনের সারিতে থাকত সাধারণ যোদ্ধারা। তারা রাজা নয়, তাই তাদের বীরত্বের কথা বা বলিদানের কথা ইতিহাসে স্থান পায়নি।
কবি প্রশ্ন করেছেন, ‘আর কেউ কাঁদেনি’? এর উত্তরে বলা যেতে পারে, আরো অনেকেই কেঁদেছিল। রাজার সৈন্য, সেনাপতি এবং তাদের পরিবারের লোকজনও চোখের জল ফেলেছিল। বরং বলা যেতে পারে, তাদের কান্নার গভীরতা আরো বেশি ছিল। উক্ত প্রশ্নের মাধ্যমে কবি সাধারণ সৈন্যদের মহত্বের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
৫. “গল্পটা আমাদের স্কুলে শোনানো হল।”-গল্পটা কী? স্কুলে গল্পটা শুনে লেখকের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ? ৪+১
উঃ 👉কর্তার সিং দুগ্গালের ‘অলৌকিক’ গল্পে গুরু নানকের মহৎ জীবনীর কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। কোনো এক ভয়ংকর গ্রীষ্মের দুপুরে, গুরু নানক তাঁর শিষ্যদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌছলেন হাসান আবদালের জঙ্গলে। গুরু নানকের অন্যতম শিষ্য মর্দানা জানাল যে তার জল তেষ্টা পেয়েছে। গুরু নানক তাকে জানালেন যে পাহাড়ের চুড়োতে বলী কান্ধারীর আশ্রমের কুয়োতেই জল পাওয়া যাবে। গুরুর কথামতো মর্দানা তিন বার বলী কান্ধারীর আশ্রমে গিয়েছিল। কিন্তু বলী কান্ধারী তাকে জল দিতে অস্বীকার করেন।
মর্দানা ব্যর্থ হয়ে নিচে নেমে আসার পর গুরু নানক তাকে সামনের পাথরটা তুলতে বলেন। পাথর তোলা মাত্রই জলের স্রোত দেখা গেল এবং মর্দানার তেষ্টা মিটল। ওদিকে বলী কান্ধারীর কুয়ো ততক্ষণে জলশূন্য হয়ে গেছে। নিচে বাবলা গাছের তলায় গুরু নানক শিষ্যদের নিয়ে বসেছিলেন। বলী কান্ধারী রেগে পাথরের একটা চাঙড় নীচের দিকে গড়িয়ে দেন। গুরু নানক সকলকে শান্তস্বরে ‘জয় নিরংকর’ ধ্বনি দিতে বলেন এবং পাথরটা কাছে আসতেই তিনি হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন। সেই পাথরের গায়ে নাকি এখনো গুরু নানকের হাতের ছাপ রয়ে গেছে
👉এই গল্পটি লেখক শুনেছিলেন তার মায়ের কাছে। কিন্তু গল্পের শেষ অংশটা তার বিশ্বাস হত না কারণ গড়িয়ে পড়া পাথরের চাঙড় হাত দিয়ে থামানো কার্যত অসম্ভব। লেখকের কাছে এই ঘটনা অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল।
৬. “চোখের জলটা তাদের জন্য।” – বক্তা কাদের জন্য চোখের জল উৎসর্গ করেছেন? যে ঘটনায় বক্তার চোখে জল এসেছিল সেই ঘটনাটি সংক্ষেপে লেখো ৷
উঃ 👉কর্তার সিং দুগ্গালের ‘অলৌকিক’ গল্পে নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য যারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করেছিল, লেখক তাঁর চোখের জলটা তাদেরকে উৎসর্গ করেছিলেন।
👉দূরের কোনো শহরে ফিরিঙ্গিরা নিরস্ত্র ভারতীয়দের উপর গুলি চালিয়েছিল। সেখানে অনেক নিরীহ মানুষ মারা গিয়েছিল এবং বাকিদের অন্য শহরের জেলে পাঠানোর হুকুম হয়েছিল। কয়েদিদের নিয়ে সেই ট্রেনটি পাঞ্জাসাহেবের উপর দিয়ে যাবে- এটা জানতে পেরে এলাকার মানুষজন অভুক্ত কয়েদিদের খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করেছিল। তারা ট্রেনটি থামানোর জন্য সমস্ত রকম চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রশাসন তাদের আবেদনে সাড়া দেয়নি। ইংরেজদের কড়া হুকুম ছিল ট্রেন কোনোমতেই থামানো যাবে না।
এরপর যা ঘটেছিল, সেইসব ঘটনা লেখক তার মায়ের এক বান্ধবীর মুখে শুনেছিলেন। কয়েদিদের খাওয়ানোর পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে দেখে সকলে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। প্রথমে পুরুষরা, তারপর মহিলারা- সকলে সারি সারি রেললাইনের উপর শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ঝড়ের বেগে ছুটে আসা ট্রেনটি রেললাইনের উপর শুয়ে থাকা মানুষগুলির বুকের উপর দিয়ে কিছুটা গিয়ে থেমে যায়।
শুধু তাই নয়, লেখকের মায়ের বান্ধবীর বিবরণ অনুযায়ী, ট্রেনটি আবার নাকি পিছোতে শুরু করে। তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন যে লাশগুলি কেটে দুমড়ে-মুচড়ে ট্রেনটি পিছিয়ে যাচ্ছিল, সকলের বুক থেকে ‘জয় নিরংকর’ ধ্বনি বেড়াচ্ছিল আর খালপারের সেতুটির দিকে রক্তের স্রোত।
এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই লেখকের চোখে জল এসেছিল।
৭. ‘হঠাৎ শিষ্য মর্দানার জল তেষ্টা পেল।’ – তেষ্টা মেটানাের জন্য মর্দানাকে কী করতে হয়েছিল? তার তেষ্টা শেষ অবধি কীভাবে মিটেছিল?
উঃ 👉কর্তার সিং দুগ্গালের ‘অলৌকিক’ গল্পে দেখা যায় গুরু নানকের অন্যতম সহচর মর্দানার প্রচন্ড জল তেষ্টা পেয়েছিল। সশিষ্য গুরু নানক তখন হাসান আব্দালের জঙ্গলে এসে পৌঁছেছেন। মার্দানার অবস্থা দেখে গুরু নানক ধ্যানে বসেন এবং চোখ খুলে তিনি বলেন যে ওই এলাকায় একমাত্র বলী কান্ধারীর আশ্রমের কুয়োতেই জল রয়েছে। গুরুর কথা শুনে মর্দানা তিনবার বলী কান্ধারীর আশ্রমে গিয়েছিল।
প্রথমবার মর্দানা গিয়ে বলী কান্ধারীকে বলেছিল যে সে পির নানকের সহচর। একথা শুনে বলী কান্ধারী তাকে জল না দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
দ্বিতীয়বার গিয়ে মর্দানা বলেছিল যে সে নানক দরবেশের অনুচর। এবারেও বলী কান্ধারী তাকে জল দেয়নি।
তৃতীয়বারে মর্দানা বলী কান্ধারীর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবারেও বলী কান্ধারী মর্দানাকে গালিগালাজ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
👉এইভাবে মর্দানা তিনবার পাহাড়ের চুড়োতে গিয়েছিল কিন্তু জল না পেয়ে সে এসে গুরু নানকের পায়ের কাছে হতচেতন হয়ে পড়ে গেল। গুরু নানক তাকে অভয় দিয়ে সামনের একটা পাথর তুলতে বললেন। পাথর তুলতেই জলের ধারা দেখা গেল। এই জলেই মর্দানার তেষ্টা মিটেছিল।
👉বিভাগ-ঙ:
১. “..আর এক রকমের প্রথা আছে-নানকার প্রথা”- নানকার প্রজাদের অবস্থা কেমন ছিল ? পরে তাদের অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল ? ১+৪
উঃ 👉সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের ‘ছাতির বদলে হাতি’ শীর্ষক পরিচ্ছদে ‘নানকার প্রথা’ নামক একটি অমানবিক প্রথার উল্লেখ রয়েছে।
আলোচ্য পরিচ্ছদে লেখক গারো পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী মানুষদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। এই অঞ্চলে জমিদার-মহাজনদের অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে লেখক এক জায়গায় নানকার প্রথার উল্লেখ করেছেন।
নানকার প্রথাঃ লেখক বলেছেন, “নানকার প্রজাদের জমিতে কোন স্বত্ব ছিল না।” এমনকি, জমির আমকাঠালেও তাদের কোনো অধিকার ছিল না। নানকার প্রজাদের জমি দেওয়ার আগে জমি জরিপ করা হতো এবং জরিপের পর আড়াই টাকা পর্যন্ত খাজনা সাব্যস্ত হতো। প্রজারা সময়মতো খাজনা দিতে না পারলে তহশিলদার প্রজাদের কাছারিতে ধরে নিয়ে যেত, পিছমোড়া করে বেঁধে মারধর করতো এবং তারপর মালঘরে আটকে রাখত। খাজনা না দেওয়ার অপরাধে সব সম্পত্তি নিলামে খাস করে নেওয়া হতো। আর এই সুযোগে মহাজনেরা কর্জা ধানে এক মণে দু’মণ সুদ আদায় করে নিত।
👉অবস্থার পরিবর্তনঃ তবে, পরবর্তীকালে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এই এলাকার ডালু চাষিরা জেগে উঠে এবং তারা বলে যে, জমিদারের খামারে ধান তুলবে না। পুলিশ-কাছারি করেও কোনো লাভ হয়নি। এইভাবে, শুধু যে জমিদারের অত্যাচার বন্ধ হয়েছিল তাই নয়, ভদ্র সমাজের কাছেও তারা তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু আদায় করতে সমর্থ হয়।
২. “তাতে চোখ কপালে উঠল।” – কে? তার চোখ কপালে ওঠার কারণ কী? ১+৪
উঃ 👉সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের ‘ছাতির বদলে হাতি’ পরিচ্ছেদে চ্যাংমানের চোখ কপালে উঠেছিল।
👉গারো পাহাড়ের নিচের কোনো গ্রাম থেকে চ্যাংমান এসেছিল হালুয়াঘাট বন্দরে সওদা করতে। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এমন বৃষ্টি যে থামবার কোনো লক্ষণ ছিল না। চ্যাংমান গিয়ে মনমোহন মহাজনের দোকানের ঝাঁপির নীচে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ মহাজনের দরদ উথলে উঠেছিল। তিনি কলকাতা থেকে সদ্য কিনে আনা নতুন ছাতাটা চ্যাংমানকে দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। চ্যাংমান প্রথমটাই নাকচ করেছিল, কিন্তু মহাজন তাকে আশ্বাস দেওয়াই সে ছাতা নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল।
এরপর থেকে সে যতবার হাটে গিয়েছিল, প্রতিবারই মহাজনকে ছাতার মূল্য দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মহাজন ‘নিচ্ছি-নেব’ করে নিতেই চায় নি। চ্যাংমান একসময় ছাতার কথা ভুলে যেতে বসেছিল। হঠাৎ একদিন মনমোহন চ্যাংমানকে পাকড়াও করে নিয়ে যায়। জাবদা খাতা খুলে মহাজন চ্যাংমানকে দেখায় যে ছাতার মূল্য বাবদ তার ঋণের পরিমাণ প্রায় হাজার খানেক টাকা। চক্রবৃদ্ধিহারে একটা ছাতির দাম সুদে-মূলে একটা হাতির দামের সমান হয়ে গিয়েছিল- এটা দেখেই চ্যাংমানের চোখ কপালে উঠেছিল।
৩. “নতুন ছাতি মাথায় দিয়ে মহাফুর্তিতে বাড়ির দিকে সে চলল”- কার কথা বলা হয়েছে? সে নতুন ছাতি কীভাবে পেল? ১+৪
উঃ 👉সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের ‘ছাতির বদলে হাতি’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে চ্যাংমান নতুন ছাতি মাথায় দিয়ে মহাফুর্তিতে বাড়ির দিকে গিয়েছিল।
👉পাহাড়তলীর কোনো এক গ্রামের চাষী চ্যাংমান। সে এসেছিল হালুয়াঘাট বন্দরের হাটে সওদা করতে। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। এমন বৃষ্টি যে থামবার কোনো লক্ষণ ছিল না। চ্যাংমান গিয়ে মনমোহন মহাজনের দোকানের ঝাঁপির নীচে আশ্রয় নেয়।
এমন সময় মনমোহন মহাজন দয়ার অবতার এককসেজে বসলেন। তিনি কলকাতা থেকে সদ্য কিনে আনা নতুন ছাতাটা চ্যাংমানকে দিয়ে বললেন “যা যা, ছাতিটা নিয়ে বাড়ি চলে যা। নিজে ভিজিস তাতে কিছু নয় কিন্তু এতগুলো পয়সার সওদা যে ভিজে পয়মাল হয়ে যাবে”।
চ্যাংমানের হাতে তখন নগদ পয়সা ছিল না। তাই সে প্রথমটাই নাকচ করেছিল। কিন্তু মহাজন তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল “নগদ পয়সা নাই বা দিলে। যখন তোমার সুবিধা হবে দিয়ে গেলেই হলো”। চ্যাংমান ভাবল এমন সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। এরপর সে নতুন ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি গিয়েছিল।
৪. হাতির-বেগার আর চলল না৷”- হাতি-বেগার আইন কী? তা আর চলল না কেন? ৩+২
উঃ 👉সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার বাংলা’ গ্রন্থের ‘গারো পাহাড়ের নীচে’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে ‘হাতিবেগার’ নামক একটি অমানবিক আইনের পরিচয় পাওয়া যায়।
👉মাঝে মাঝে জমিদারের শখ হত হাতি ধরার। কিন্তু হাতি তো তার প্রজা নয় যে সহজেই ধরা দেবে। জমিদারের শখ পূরণ করার জন্য প্রত্যেক গ্রাম থেকে প্রজাদেরকে আসতে হত। এই কাজের জন্য তারা জমিদারের কাছে কোনো মজুরি তো পেতই না, এমনকি নিজেদের খাবার ব্যবস্থাও নিজেদেরকেই করতে হত। যে জঙ্গলে হাতি থাকতো সেই জঙ্গলটিকে প্রজারা বেড় দিয়ে ঘিরে থাকতো। আর হাতি ধরার শখ যার, সেই জমিদার সেপাইসন্ত্রী নিয়ে বসে থাকতেন পাহাড়ের উপর উঁচু মাচাতে। এদিকে হাতি ধরতে গিয়ে কোনো প্রজা মরতো সাপের কামড়ে কেউবা যেতো বাঘের পেটে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অত্যাচার বেশিদিন সহ্য করেনি। গোরাচাঁদ মাস্টারের নেতৃত্বে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। কামারশালায় তৈরি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা জমিদারের পল্টনের সঙ্গে লড়াই করেছিল। জমিদারের লোকবলের কাছে প্রজাদের পরাজয় ঘটলেও হাতিবেগার আইন চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
👉বিভাগ-চ:
১. শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারাগুলি উল্লেখ করে যে-কোনো দুটি ধারার উদাহরণ সহ পরিচয় দাও ৷ ১+২+২
উঃ👉 সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে। শব্দার্থের এই পরিবর্তন শব্দার্থতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। মূলত তিনটি ধারাতে শব্দার্থের এই পরিবর্তন সাধিত হয়। সেগুলি হল-
👉১) শব্দার্থের প্রসার- একটি শব্দ আদিতে যে অর্থ প্রকাশ করত বর্তমানে যদি তার থেকে ব্যাপকতর কোন অর্থ প্রকাশ করে থাকে তবে শব্দার্থতত্ত্বের আলোচনায় সেটিকে শব্দার্থের প্রসার বলে গণ্য করা হয়। যেমন, আগে ‘কালি’ বলতে কালো রঙের তরল পদার্থকে বোঝাত কিন্তু বর্তমানে কালো ছাড়াও লাল, নীল, সবুজ প্রকৃতি সকল রঙের তরলকেই কালি বলা হয়।
২) শব্দার্থের সংকোচ- একটি শব্দ আদিতে যে অর্থ প্রকাশ করত বর্তমানে যদি সেই অর্থের ব্যাপকতা হ্রাস পায় তবে শব্দার্থ তত্ত্বের আলোচনায় সেটিকে শব্দার্থের সংকোচ হিসাবে গণ্য করা হয়। যেমনঃ ‘অন্ন’ শব্দের আদি অর্থ ছিল খাদ্য কিন্তু বর্তমানে অন্ন বলতে কেবলমাত্র ভাতকেই বোঝায়।
৩) শব্দার্থের রূপান্তর- অনেক সময়ই শব্দের অর্থ এইভাবে পরিবর্তিত হয় যে বর্তমান রূপ দেখে তার আগের অর্থ বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এই ধরণের পরিবর্তনকে শব্দর্থের রূপান্তর বলা হয়। যেমনঃ ‘দারুণ’ শব্দের আদি অর্থ কাষ্ঠনির্মিত কিন্তু বর্তমানে ‘দারুণ’ বলতে বোঝায় অত্যন্ত।
২. মুণ্ডমাল শব্দ কাকে বলে? উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও। ৫
উঃ 👉রূপতত্ত্বের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মুন্ডমাল শব্দ, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় অ্যাক্রোনিম (Acronym)।
মুন্ডমাল শব্দঃ
সাধারণ অর্থে মুন্ডমাল বলতে বোঝায় মুন্ড বা মস্তকের মালা। কিন্তু রূপতত্ত্বের আলোচনায় মুন্ডমাল হল বিশেষ এক ধরনের শব্দ বা শব্দ গঠনের প্রক্রিয়া। কোনো শব্দগুচ্ছের আদ্য অক্ষর (অর্থাৎ, প্রথম অক্ষর) নিয়ে গঠিত শব্দকে মুন্ডমাল শব্দ বা অ্যাক্রোনিম বলে। যেমন- লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক শব্দগুচ্ছের প্রথম অক্ষরগুলি নিয়ে গঠিত হয়েছে ল.সা.গু. শব্দটি। এই ল.সা.গু. শব্দটি হল মুন্ডমাল শব্দ। একইরকমভাবে, গ.সা.গু. (গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক), বি.বা.দী. (বিনয়-বাদল-দীনেশ) শব্দগুলি বাংলা মুন্ডমাল শব্দের উদাহরণ।
বাংলা মুন্ডমাল শব্দের সংখ্যাটা কম তবে ইংরেজি ভাষায় এই জাতীয় শব্দের সংখ্যা প্রচুর এবং সেগুলি বাংলাতেও বহুল প্রচলিত। যেমন, ভি.আই.পি (ভেরি ইম্পরট্যান্ট পার্সন), এম.এল.এ (মেম্বার অফ লেজিসলেটিভ এসেম্বলি) ইত্যাদি।
৩. রূপমূল কাকে বলে? উদাহরণসহ স্বাধীন ও পরাধীন রূপমূলের পরিচয় দাও ৷ ১+২+২
উঃ 👉রূপতত্ত্বের প্রধান আলোচনার বিষয় হল রূপ। ভাষার ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ একক হল রূপ। রূপের দুরকম পরিচয় বর্তমান- একটি হল রূপমূল এবং অপরটি হল সহরূপ। ভাষায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্রতম অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছকেই বলা হয় রূপমূল। প্রসঙ্গত বলা যায়, রূপমূলের বিকল্পগুলিকে বলা হয় সহরূপ।
স্বাধীন ও পরাধীন রূপমূল
👉রূপমূলকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১) স্বাধীন রূপমূল- যে রূপমূলগুলি ভাষায় স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, তাদেরকে স্বাধীন রূপমূল বলা হয়। অন্যভাবে বললে, যেসকল রূপমূল বাক্যে ব্যবহার করতে গেলে অন্য কোনো রূপমূলের উপর নির্ভর করতে হয় না, তাদেরকে স্বাধীন রূপমূল বলে।
২) পরাধীন রূপমূল- যে রূপমূলগুলি ভাষায় স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না, বরং কোনো স্বাধীন রূপমূলকে অবলম্বন করে ভাষায় ব্যবহৃত হয়, তাদেরকে পরাধীন রূপমূল বলা হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, /ছেলেটি/ এই শব্দটিতে দুটি রূপমূল রয়েছে- {ছেলে} এবং {টি}। {ছেলে} হল স্বাধীন রূপমূল এবং {টি} হল পরাধীন রূপমূল। কারণ, {ছেলে} রূপমূলটি ভাষায় নানাভাবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং সর্বদাই এককভাবে ব্যবহৃত হতে পারবে। যেমন- ‘রামবাবুর ছেলে বিদেশে থাকে’, ‘তার ছেলে ডাক্তার’ ইত্যাদি। কিন্তু {টি} রূপমূলটি যখনই ভাষায় প্রয়োগ করা হোক সর্বদাই একটি স্বাধীন রূপমূলকে (যেমন, এখানে ‘ছেলে’-কে) অবলম্বন করে বাক্যে ব্যবহৃত হবে।
৪. উদাহরণসহ গুচ্ছধ্বনি এবং যুক্তধ্বনির পরিচয় দাও। ৫
উঃ ধ্বনিতত্ত্বের অন্যতম কাজ হল ধ্বনিমূলের অবস্থান এবং ধ্বনির সমাবেশ নিয়ে আলোচনা করা। ধ্বনি সমাবেশের অন্তর্গত দুটি বিষয় হল- গুছধ্বনি এবং যুক্তধ্বনি।
গুচ্ছধ্বনি– পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ব্যাঞ্জনধ্বনি যে যুগ্মধ্বনি তৈরি করে তাকে গুচ্ছধ্বনি বলে। অর্থাৎ, যে দুটি ব্যাঞ্জনধ্বনির মাঝখানে কোন স্বরধ্বনি নেই সেই ব্যঞ্জন দুটির যুগ্মধনিকে গুচ্ছধনি বলে।
গুচ্ছধ্বনির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল এতে দলসীমা বর্তমান থাকে অর্থাৎ গুচ্ছধ্বনির অন্তর্গত ধ্বনিগুলি পৃথক দল।
বাংলায় দুটি ব্যঞ্জন ধ্বনিতে তৈরি ধ্বনিগুচ্ছের সংখ্যা-২০০, তিনটি ব্যাঞ্জনধ্বনি দিয়ে তৈরি গুচ্ছধ্বনির সংখ্যা-৪ এবং চারটি ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে তৈরি গুচ্ছধ্বনির সংখ্যা-১ টি।
ধ্বনিগুচ্ছের উদাহরন–
অজন্তা= অ+জ+অ+ন+ত+আ (এখানে ‘ন্ত’ হল গুচ্ছধ্বনি)
শ্রদ্ধা=শ্+র্+অ+দ্+ধ+আ (এখানে ‘দ্ধ’ হল গুচ্ছধ্বনি)
যুক্তধ্বনি– যে ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশগুলি শব্দের আদিতে উচ্চারিত হতে পারে সেগুলিকে যুক্তধ্বনি বলে। এখানে দলসীমা থাকে না।
দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির সমাবেশে যুক্তধ্বনি তৈরি হলে প্রথম ব্যঞ্জনধ্বনিটি [স] অথবা দ্বিতীয় ব্যঞ্জনটি [র] বা [ল] হবে। বাংলায় এই রকম ২৪ টি যুক্তধ্বনি রয়েছে। এছাড়া ইংরাজি থেকে আমদানি করা ১৪ টি যুক্তধ্বনি রয়েছে। তিনটি ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে তৈরি যুক্ত ধ্বনির সংখ্যা- ২টি।
যুক্তধ্বনির উদাহরন-
স্নান=স্+ন্+আ+ন্ (এখানে ‘স্ন’ হল যুক্ত ধ্বনি)
ম্লান=ম্+ল+আ+ন্ (এখানে ‘ম্ল’ হল যুক্তধ্বনি)।
৫. শব্দার্থের উপাদানমূলক তত্ত্বটি উদাহরণ-সহ ব্যাখ্যা করো ৷ ৫
উঃ শব্দার্থতত্ত্বের আলোচনায় একটি বিশিষ্ট ধারা হলো শব্দার্থের উপাদানমূলক বিশ্লেষণ তত্ত্ব। এই দত্তের মূল কথা হল, শব্দ আসলে কয়েকটি শব্দার্থ উপাদানেরে সমষ্টি।
কোনো বস্তুকে ক্রমাগত ভাঙতে থাকলে তার মধ্যে যেমন অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ পাওয়া যায়, তেমনি কোনো শব্দকে বিশ্লেষণ করলেও এইরকম অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদান পাওয়া যায়। শব্দের এই ছোট ছোট উপাদান গুলিকে বলা হয় শব্দার্থ উপাদান। এই ধারণা অনুযায়ী, শব্দ হল কিছু শব্দার্থ উপাদানের সমষ্টি। শব্দার্থ উপাদানগুলির মাধ্যমেই কোনো শব্দ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব এবং শব্দটিকে কোনো বিশেষ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নিচে একটি উদাহরণের সাহায্যে শব্দার্থের উপাদানামূলক তত্ত্বটি প্রয়োগ করা হল-
পুরুষ, নারী এবং শিশু- এই তিনটি শব্দই মানুষকে বোঝাচ্ছে। অর্থাৎ, এই তিনটি শব্দেই যে শব্দার্থ উপাদানটি রয়েছে সেটি হল- মানবজাতীয়। আবার, পুরুষ এবং নারী শব্দদুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বোঝায় কিন্তু শিশু বলতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বোঝানো হয়। তাছাড়া, পুরুষ বলতে বোঝায় পুরুষজাতীয় মানুষ, নারী বলতে বোঝায় স্ত্রীলোক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এই শ্রেণিকরণ প্রযোজ্য নয়।
এইভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ‘পুরুষ’, ‘নারী’ এবং ‘শিশু’ এই তিনটি শব্দ তিনরকম শব্দার্থ উপাদানের সমষ্টি। সেগুলি হল- প্রজাতিগত (মানব), বয়সগত (প্রাপ্তবয়স্ক অথবা অপ্রাপ্তবয়স্ক) এবং লিঙ্গগত (স্ত্রী, পুরুষ ইত্যাদি)।
👉বিভাগ-ছ:
১.বাংলা সঙ্গীতের ধারায় অতুলপ্রসাদ সেনের কৃতিত্ব আলোচনা কর ?
উত্তর- বাংলা সঙ্গীতের জগতে অতুলপ্রসাদ সেন একজন উল্লেখযোগ্য বাক্তি (১৮৭১-১৯৩৪খ্রি)। অতুলপ্রসাদ একধারে সঙ্গীতজ্ঞ, গীতিকার, সঙ্গীত বিশারদ এবং শিল্পী ছিলেন । তাঁর রচিত গান গুলিকে ৫ টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-
রাগাশ্রয়ী গান– গানের বিভিন্ন অঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাগ মিশ্রণের ফলে তাঁর রাগাশ্রয়ী গান গুলি অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছে। ‘ডাকে কোয়েলা বারে বারে’ ‘মুরুলি কাঁদে রাঁধে রাঁধে’ প্রভৃতি গানগুলি বিশেষভাবে রসোত্তীর্ণ হয়েছে।
গজল, টপ্পা ও ঠুংরি – বাংলা ভাষার গজল রচনায় অতুলপ্রসাদ পথিকৃত ছিলেন। ‘কে গো তুমি বিরহিণী’, ‘কত গান তো হল গাওয়া’ প্রভৃতি গানগুলি উল্লেখযোগ্য। তাঁর টপ্পা ও ঠুংরি গানে উত্তরপ্রদেশের কাজরি ও লগনী গানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
স্বদেশী সঙ্গীত – ‘ওঠো গো ভারত লক্ষী’, ‘বলো বলো বলো সবে’ প্রভৃতি স্বদেশ গীতিগুলি এখনো সমান জনপ্রিয়।
ঋতু সঙ্গীত– অতুল প্রসাদের অনেক গানের বিভিন্ন ঋতু সার্থকভাবে চিত্রিত হয়েছে। যেমন- ‘বধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে’, ‘আইল আজি বসন্ত মরি মরি’ প্রভৃতি গানগুলি যথার্থ ঋতুসঙ্গীতে হয়ে উঠেছে।
অনান্য– উপরোক্ত শ্রেণী ছাড়াও অতুলপ্রসাদ বাউল কীর্তন, ভাটিয়ালি প্রভৃতি দেশজ সুরে বহু গান রচনা করেছেন। তাঁর লেখা গান গুলি ‘কাকলি’,‘কয়েকটি গান’,‘গীতগুঞ্জ’ এই তিনটি বইয়ে সংকলিত হয়েছে।
১. বাংলা গানের ধারায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করে৷ ৫
উঃ বাংলা সঙ্গীতের ধারায় রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক আর একজন সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
হলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় । তাঁর পিতা কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন
কৃষ্ণনগর রাজসভার দেওয়ান এবং উনিশ শতকের প্রথম দিকে খেয়াল-চর্চাকারীদের
মধ্যে অন্যতম । সেই সুত্রে দ্বিজেন্দ্রলালেরও ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের উপর
বিশেষ দখল ছিল। ১৮৮৪ খ্রি ইংল্যান্ডে বসবাসকালীন বিদেশি সুরের সান্নিধ্যে
আসেন এবং নিজ প্রতিভাবলে সেগুলি আত্মস্থ করেন। দ্বিজেন্দ্রলালের গানে
প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা,
বাউল, স্বদেশী গান এবং প্যারোডি- ভারতীয় সঙ্গীতের বিচিত্র শাখায় তাঁর
অনায়াস বিচরন ছিল। ভারতীয় সঙ্গীতের কমনীয়তা এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের
প্রানশক্তি দ্বিজেন্দ্রলালের গানগুলিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
দ্বিজেন্দ্রলালের সবচেয়ে বেশী খ্যাতি নাট্যকার হিসেবে। প্রায় সমস্ত নাটকেই তিনি সার্থকভাবে গানের প্রয়োগ করেছেন। ‘সাজাহান’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘রানাপ্রতাপ’, ‘মেবার পতন’ প্রভৃতি নাটকগুলির গানও বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর ‘সোরাবরুস্তম’ নাটকটি বিদেশি অপেরার ঢঙে রচিত হয়েছিল। আবার কোরাস গানের প্রয়োগেও তিনি পথিকৃৎ ছিলেন।
তাঁরই সুযোগ্য পুত্র দিলীপ কুমার রায় দ্বিজেন্দ্রলালের গানগুলিকে ৫ ভাগে ভাগ করেছেন। যথা- পূজা , দেশ, প্রেম, প্রকৃতি, এবং বিবিধ। তবে স্বদেশসঙ্গীতগুলির কারনেই দ্বিজেন্দ্রলাল চিরস্মরনীয় থাকবেন । ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’, ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ প্রভৃতি গানগুলি বাঙালির অন্তরে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। ‘আর্যগাথা’ গীতি সংকলনে তাঁর গানগুলি লিপিবদ্ধ রয়েছে।
২. বঙ্গদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে ভাস্কর ও চিত্রকর রামকিঙ্কর বেইজের অবদান ও স্বকীয়তা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো। ৫
উঃ আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যকলার একজন বিশিষ্ট শিল্পী ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ (১৯০৬- ১৯৮০)। তাঁকে শুধু একজন শিল্পী বললে কম বলা হবে, তিনি ছিলেন একজন শিল্পসাধক। রামকিঙ্কর ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর।
রামকিঙ্কর ১৯০৬ সালে বাঁকুড়ার জুগিপাড়ায় এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কুমোরদের কাজ দেখে তিনি বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই কাদা দিয়ে মূর্তি গড়েছেন। এমনি করেই ভাস্কর্য শিল্পের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯২৫ সালে ‘প্রবাসী’র সম্পাদক রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের পরামর্শে তিনি বিশ্বভারতীর কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানে আচার্য নন্দলাল বসু ছিলেন তাঁর শিক্ষক। কথিত আছে, কলাভবনে তাঁর কাজের নমুনা দেখে নন্দলাল প্রথম দিনই বলেছিলেন, ‘‘তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?’’ রামকিঙ্কর ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী ছিলেন, তবে এই শান্তিনিকেতনেই তাঁর ভাস্কর্যকলা পূর্ণমাত্রায় বিকাশ লাভ করেছিল।
বিশেষত্ব
১) রামকিঙ্করের ছবিগুলি ছিল প্রকৃতিকেন্দ্রিক।
২) প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই ছিল তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বহু শিল্পকর্মে এসব মানুষের দেখা মেলে।
৩) উন্মুক্ত ভাস্কর্য নির্মাণে তিনি সিমেন্ট ও পাথর ব্যবহার করতেন।
৪) তিনি পাশ্চাত্য শিল্পীদের মত মডেল ব্যবহার করতেন।
৫) ভাস্কর্যে টেরাকোটা রিলিফ ও পাথর খোদাইয়ে এবং চিত্রশিল্পে জল ও তেলরঙে তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন।
উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম– চিত্রশিল্পী হিসেবে রামকিঙ্করের প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় ‘কুকুর সাথে রমণী’, ‘পিকনিক’, ‘ঝড়ের পরে’, ‘বিনোদিনী’ প্রভৃতি ছবিতে। তাঁর উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের নমুনা হল ‘সুজাতা’, ‘সাঁওতাল দম্পতি’, ‘হাটের পথে’ প্রভৃতি।
পুরস্কার ও সম্মাননা– তিনি বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডি. লিট এবং ভারত সরকারের খেতাব ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেছেন।
৩. বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো৷ ৫
উঃ যে বাঙালি চলচ্চিত্রকার আন্তর্জাতিক মহলে বাংলা সিনেমাকে পরিচিতি দিয়েছিলেন, তিনি হলেন সত্যজিৎ রায় (১৯২১- ১৯৯২)। তিনি একইসঙ্গে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সঙ্গীত পরিচালক এবং গীতিকার। তাঁর হাতে বাংলা সিনেমার নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য সিনেমা
সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫)। কান চলচ্চিত্র উৎসবে এই সিনেমাটি ‘দ্য বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ শিরোপা পেয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’- এই তিনটি সিনেমাকে একত্রে অপু ট্রিলজি বলা হয়। তাঁর অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘জলসাঘর’, ‘পরশপাথর’, ‘চারুলতা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’, ‘জন অরণ্য’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ‘তিন কন্যা’, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘শাখা প্রশাখা’, ‘নায়ক’ ইত্যাদি।
এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ সিনেমাগুলি এখনো সমান জনপ্রিয়।
বিশেষত্ব:
(১) সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা প্রকৃত অর্থেই আর্ট এবং আর্ট বলেই সেগুলির আবেদন সার্বজনীন।
(২) তাঁর প্রতিটি সিনেমাতেই মৌলিক সৃজনী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।
(৩) তাঁর ছবির বিষয় এবং আঙ্গিক ছিল বহুমুখী।
(৪) তাঁর ছবির চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে ক্যামেরা, সম্পাদনা, সংগীত পরিচালনা সব বিষয়ই তিনি তত্ত্বাবধান করতেন।
(৫) অনেক সমালোচকের মতে সত্যজিৎ রায় ছিলেন শিশু অভিনেতাদের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর অবদানের জন্য সত্যজিৎ রায় বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি, ফ্রান্সের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার লেজিওঁ অফ অনার, ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার একাডেমি (অস্কার) সম্মানসূচক পুরস্কার। এছাড়া মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁকে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়।
৪. বাঙালির ক্রীড়া ঐতিহ্যে ফুটবলের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল ? এই পর্বের ফুটবলের সঙ্গে কোন্ বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে আছে? বাংলার ফুটবলের কোন ঘটনা, কীভাবে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল ? ১+১+৩
উঃ বাঙালির ক্রীড়া ঐতিহ্যে ফুটবলের সূত্রপাত হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কলকাতায় পুরনো কেল্লার মাঠে ব্রিটিশ নাবিকদের ফুটবল খেলা দেখে বাঙালি সৈনিকদের ফুটবলের সঙ্গে পরিচিতি ঘটেছিল।
এই পর্বের ফুটবলের সঙ্গে যে বিখ্যাত মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে তিনি হলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী।
বাঙালির ক্রিড়া সংস্কৃতিতে ফুটবলের একটি বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। ব্রিটিশদের মাধ্যমে বাংলাতে ফুটবলের প্রচলন হলেও বাংলার ফুটবল ইংল্যান্ডের থেকে খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না। ইংল্যান্ডের অনুকরণে কলকাতাতে বেশ কয়েকটি ফুটবল ক্লাবের জন্ম হয়েছিল এবং বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছিল। ১৮৯৩ সালে গঠন করা হয় ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং সেই বছরই শোভাবাজার ক্লাবের উদ্যোগে প্রবর্তন করা হয় আইএফএ শিল্ড। ফুটবলপ্রেমী বাঙালিদের মধ্যে আইএফএ শিল্ড অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
কিন্তু IFA শিল্ড শুরু হওয়ার পর থেকে টানা ১৮ বছর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দখলে ছিল। ১৯১১ সালে East Yorkshire Regiment কে হারিয়ে বিজয়ী হয় মোহনবাগান ক্লাব। ঐতিহাসিক এই জয় ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল কারণ এই প্রথম ব্রিটিশদের খেলাতে ব্রিটিশদেরকেই পরাজিত করেছিল ভারতীয়রা। এই জয় ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের নৈতিক জয়।
৫. বাংলা সংগীতের ধারায় কাজী নজরুল ইসলামের অবদান আলোচনা করো।
উঃ বাংলা সঙ্গীতের ধারায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯- ১৯৭৬) নিজেই যেন একটা অধ্যায়। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং সর্বোপরি একজন সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা তিন হাজারের কিছু বেশি এবং এগুলি বাঙালি সংস্কৃতির অতুলনীয় সম্পদবিশেষ।
গীতিকার হিসেবে নজরুলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২৮ সালে, গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির গীতিকার হিসাবে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে নজরুলের শিল্পী জীবনের সূত্রপাত হয় ছোটবেলাতেই। লেটোর দলে কাজ করার সময়ই তাঁর গান রচনার সূচনা হয়েছিল। এই ভ্রাম্যমাণ যাত্রাদলের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে নজরুল বাংলার লোকসঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এবং একইসঙ্গে হিন্দু পুরাণ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। আবার, সৈনিক হিসেবে মিলিটারি ব্যান্ডের মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও ফারসি কবিতার সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর বিচিত্র জীবন-অভিজ্ঞতা গীতিকার নজরুলকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।
নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভা বিচিত্র এবং বহুমুখী। তাঁর গানগুলিকে নিম্নোক্ত শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে।
দেশাত্মবোধক গান– ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল’ ইত্যাদি।
গজল– ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘দুরন্ত বায়ু পুরবইয়া’, ‘চেয়ো না সুনয়না’, ‘বসিয়া নদীকূলে’ ইত্যাদি।
রাগাশ্রয়ী– বিভিন্ন রাগ-রাগিনী ব্যবহার করে নজরুল অসংখ্য গান লিখেছেন। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হল- ‘ভোরের হাওয়া এলে ঘুম ভাঙাতে’ (রামকেলী), ‘আমার কোনো কূলে আজ ভিড়লো তরী’ (খাম্বাজ-দাদরা) ইত্যাদি।
হিন্দু ভক্তিগীতি– ‘শ্যামা বড়ো লাজুক মেয়ে’, ‘জাগো জাগো শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী’, ‘জাগো হে রুদ্র জাগো রুদ্রাণী’ ইত্যাদি।
ইসলামি গান- ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ প্রভৃতি।
লোকসংগীত– ‘আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল’, ‘সারাদিন পিটি কার দালানের ছাদ’, ‘কুচ বরণ কন্যারে’ ইত্যাদি।
প্রভাবিত গান– দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গানের সুরে প্রভাবিত হয়ে নজরুল যেসব গান রচনা করেছিলেন, সেগুলিকে প্রভাবিত গান বলা হয়। যেমন, ‘মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে’, ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ইত্যাদি।
এছাড়াও রয়েছে হাস্যরসাত্মক এবং প্যারোডি গান, নতুন তালের গান, হিন্দি গান এবং ছায়াছবির গান। এইভাবে তাঁর গানে বাংলা সঙ্গীতের সমস্ত ধারার মিলন ঘটেছে।
৬.‘পট’ শব্দটির অর্থ কী? এই শিল্পটি সম্পর্কে আলোচনা করো ৷
উঃ 👉‘পট’ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল চিত্র।
👉লোকশিল্পের একটি অতিপ্রাচীন ধারা হল পট। কাপড়ের উপর কাদামাটি কিম্বা গোবরের প্রলেপ দিয়ে জমিন তৈরি করে পট আঁকা হত। ওই পট নিয়ে শিল্পী গান গাইতেন। সপ্তম শতকেও পটের চল ছিল বলে জানা যায়। সেই সময় পটের বিষয় ছিল বুদ্ধদেবের জীবনী। ত্রয়োদশ শতকে পটশিল্প বিস্তার লাভ করেছিল। আরও পরে পনেরো শতকে গাজীর পট জনপ্রিয় হয়েছিল। ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের বাণী প্রচারের জন্যও পটের ব্যবহার হত। উনিশ শতকে কালীঘাট পট বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য চিত্রশৈলী মিশিয়ে কালীঘাট পট তৈরি হত। ‘মোহন্ত ও এলোকেশী’ এই পটের উদাহরণ।
যারা পট তৈরি করতেন তাদের বলা হত পটুয়া। কয়েকটি প্যানেলে ক্যানভাসকে ব্যবহার করে পটুয়ারা কোনো কাহিনীকে ফুটিয়ে তুলতেন। সাধারণত পৌরাণিক কাহিনী বা লোকগাথা পটের মাধ্যমে তুলে ধরা হত। পটের কাহিনীকে গায়েনরা গান গেয়ে প্রকাশ করতেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে এটি মানুষের মনোরঞ্জনের মাধ্যম ছিল। তবে রামায়ণ, মহাভারতের পাশাপাশি সত্যপীর বা গাজীর পটও মানুষের প্রিয় ছিল।
রাজস্থানেও পটশিল্পের প্রচলন ছিল। তবে বিষয়বৈচিত্র্যে তা বাংলার পটের সমতুল্য ছিল না। এক আনা মুল্যের বিনিময়ে একটি পট কেনার জন্য মানুষ ভিড় জমাত বলে জানা যায়। এমনকি বাংলার এই পট প্যারিসে পসার জমিয়েছিল। আর সেখানে এর অন্যতম খদ্দের ছিলেন পিকাসো। পিকাসোর চিত্রশৈলীতে কালীঘাটের প্রভাব আছে বলে অনেকে মনে করেন। যাইহোক, উনিশ শতক পর্যন্ত বাংলায় এই পটশিল্পের রমরমা ছিল। এগুলি শুধু উৎকৃষ্ট শিল্পসামগ্রী নয়, সমকালীন সমাজের মুল্যবান দলিল হিসেবেও বাংলার পটের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
৭. চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিধানচন্দ্র রায়ের অবদান আলোচনা করো।
উঃ পশ্চিমবঙ্গের রূপকার তথা পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় (১৮৮২- ১৯৬২) চিকিৎসক হিসেবে তাঁর জীবদ্দশাতেই একজন কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এল. এম. এস ও এম. বি. পাশ করেন এবং ১৯০৮ সানি এমডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯০৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড গিয়ে একইসঙ্গে এম. আর. সি. পি এবং এফ. আর. সি. এস পাশ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
দেশে ফিরে তিনি প্রথমে ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক (১৯১১) এবং পরে কারমাইকেল মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপকের পদ (১৯১৮) গ্রহণ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিসও শুরু করেন। চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কেবল কলকাতা বা বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সমকালে ডঃ রায় ভারতের চিকিৎসকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন। ভারতের বাইরেও তাঁর চিকিৎসার কদর ছিল।
তাঁর রোগীদের তালিকায় ছিলেন তখনকার দিনের বিখ্যাত সব গুণীজন। যেমন- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, বল্লভ ভাই প্যাটেল, মৌলানা আজাদ, জওহরলাল নেহরু, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎসা-পরামর্শ নিতেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলি প্রমুখ রাষ্ট্রনেতা তাঁর গুণগ্রাহী ছিলেন। গান্ধীজি অনশন করলেই সব কাজ ছেড়ে বিধানচন্দ্র রায় ছুটে যেতেন তাঁর সেবা করার জন্য।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি নিজের বাড়িতে নিয়মিত বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন। এই কাজে তিনি নিজ অর্থব্যয়ে আরো দু’জন চিকিৎসক নিযুক্ত করেছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই অকৃতদার মানুষটি মানবসেবায় ব্রতী ছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ পান। ১৯৬২ সালে নিজের জন্মদিনেই অর্থাৎ ১লা জুলাই তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর সম্মানে প্রতিবছর ওই দিনটি ‘চিকিৎসক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
৮. বাংলা চিকিৎসাবিজ্ঞানে কাদম্বিনী (বসু) গঙ্গোপাধ্যায়ের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করো৷ ৫
উঃউনবিংশ শতকের প্রথমার্ধেই ভারতে স্ত্রী শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু তখনো পর্যন্ত মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে যায়নি। ১৮৭৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন কর্তৃপক্ষ (সিনেট) মেয়েদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভের দাবি মেনে নেয়। এরপরেই ১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু এবং চন্দ্রমুখী বসু প্রথম মহিলা স্নাতক হন। চন্দ্রমুখী স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং কাদম্বিনী বসু কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রথম মহিলা ছাত্রী হিসেবে ডাক্তারি পড়া শুরু করেন (১৮৮৪)।
ডিগ্রী লাভ করার পর কাদম্বিনী লেডি ডাফরিন হাসপাতালের চিকিৎসকরূপে নিযুক্ত হন। ১৯৯২ সালে স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেরণায় তিনি ডাক্তারি পড়ার জন্য বিলেত যাত্রা করেন। LRCP (এডিনবরা), LRCS (গ্লাসগো), এবং GFPS (ডাবলিন) ডিগ্রি নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন এবং চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
কৃতিত্ব
(১) কাদম্বিনী বসু (গঙ্গোপাধ্যায়) বাংলা তথা ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তার এবং একইসঙ্গে বিলেতি ডিগ্রিধারী প্রথম মহিলা চিকিৎসক। প্রায় সমসাময়িক আর একজন ভারতীয় নারী যিনি বিদেশ থেকে ডাক্তারী পাশ করে দেশে ফিরেছিলেন, যার নাম আনন্দী গোপাল জোশী, তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে মারা যান। অর্থাৎ, চিকিৎসক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করতেই পারেননি। তাই কাদম্বিনী বসুই ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক।
(২) যে সময় বাড়ির মেয়েদের বাইরে পা রাখার আগে দশবার ভাবতে হতো, সেই সময় একজন মেয়ের পক্ষে ডাক্তারি পাশ করাটাই বোধহয় সবথেকে বড় কৃতিত্ব। তৎকালীন সমাজ কাদম্বিনীকে প্রতি পদে বাধা দিয়েছিল, এমনকি রুক্ষনশীল শিক্ষকসমাজ ডাক্তারি পাস করার পরেও তাঁকে ডাক্তারির ডিগ্রি না দিয়ে ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দি মেডিকেল কলেজ অফ বেঙ্গল’ সার্টিফিকেট দিয়েছিল। এরপরেও তিনি ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, এটাও কম কৃতিত্বের নয়।
(৩) তিনি সমকালে একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে বহু জটিল রোগির চিকিৎসা করেছিলেন এবং বহু অস্ত্রোপচারও করেছিলেন।
(৪) তাঁর ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত সমকালীন মেয়েদের প্রেরণা জুগিয়েছিল।
(৫) চিকিৎসা ছাড়াও তিনি অনেক সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
(৬) ১৮৯৫ সালে নেপালের রাজমাতার চিকিৎসার্থে তিনি নেপালে যান এবং সেখানে আধুনিক জনচিকিৎসার সূচনা করেন।
৯. বাংলা চলচ্চিত্রের ধারায় পরিচালক মৃণাল সেনের অবদান আলোচনা করো। ৫
উঃ বাংলা সিনেমার বিকাশের ধারায় মৃনাল সেনের (১৯২৩-২০১৮) অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। ১৯৫৫ সালে ‘রাতভোর’ ছবির মাধ্যমে তাঁর পথচলা শুরু। চলচ্চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ প্রভৃতি অনেক কাজের মধ্য দিয়ে এই কৃতীর কর্মধারা বহমান ছিল।
অবদান
প্রথম ছবিতে সাফল্য না পেলেও তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’(১৯৫৮) তাঁকে আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছিল। তারপর একে একে ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০), ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯), ইন্টারভিউ (১৯৭১), ক্যালকাটা ৭১(১৯৭২), পদাতিক (১৯৭৩), একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯), খারিজ (১৯৮২), আকালের সন্ধানে(১৯৮২) প্রভৃতি ছবিগুলি স্বদেশে এবং বিদেশে সমাদৃত হয়েছে।
তাঁর অন্যান্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘আকাশ কুসুম, ‘মৃগয়া’, ‘চালচিত্র’, ‘খন্ডহর’, ‘অন্তরীন’ এবং সর্বশেষ ২০০২ সালে ‘আমার ভুবন’। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে তিনি বাংলা ছাড়াও উড়িয়া (মাটির মনিষ), তেলেগু (ওকা উরি কথা) এবং হিন্দি (ভুবনসোম) ভাষাতেও ছবি নির্মান করেছেন।
অনন্যতা– মৃণাল সেনের ছবিতে
(১) আমরা সেই ভারতবর্ষের পরিচয় পাই যা বিভূতিভূষণের উপন্যাসে পেয়ে থাকি;
(২) মধ্যবিত্ত মানসিকতার প্রতিফলন খুব বেশি চোখে পড়ে;
(৩) সত্তরের দশকের অস্থির সমাজব্যাবস্থার ছবি দেখতে পাই;
(৪) অসহায়, বঞ্চিত ও শোষিত মানবাত্মার কথা তুলে ধরে;
(৫) একটি নতুন ধারার সন্ধান পাই যা পরবর্তীকালের অনেক চলচিত্র নির্মাতাকে প্রভাবিত করেছে।
সন্মান ও পুরস্কার
তাঁর ছবি যেমন অনেক পুরষ্কারে সন্মানিত হয়েছে তেমন তিনিও দেশে বিদেশে অনেক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন যার মধ্যে ১৯৮১ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ২০০৫ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার, রাশিয়ার ‘অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ’ ও ফ্রান্সের ‘কমান্ডার অফ দি অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
১০. বাংলা গানের ধারায় সলিল চৌধুরীর বিশিষ্টতা সম্পর্কে আলোচনা করো। ৫
উঃ বাংলা তথা ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নাম হল সলিল চৌধুরী (১৯২৩- ১৯৯৫)। প্রথম জীবনে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ‘বিচারপতি’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’র মতো বহু সার্থক গণসঙ্গীতের স্রষ্টা তিনি।
বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৯ সালে ‘পরিবর্তন‘ ছবির মাধ্যমে। ‘বাঁশের কেল্লা’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘গঙ্গা’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘লালপাথর’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘হারানের নাতজামাই’ প্রভৃতি বহু বাংলা ছবিতে তিনি সুরারোপ করেছিলেন।
১৯৫৩ সালে নির্মিত ‘দো বিঘা জমিন‘ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমার সংগীতকার হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হয়। এরপর একে একে ‘জাগতে রহো’, ‘মুসাফির’, ‘মধুমতি’, ‘হাফটিকিট’, ‘আনন্দ’, ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ সহ প্রায় ৭৫ টি হিন্দি সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন।
বাংলা, হিন্দি ছাড়াও তিনি প্রায় ২৬টি মালায়ালাম ছবিতে এবং বেশ কিছু তামিল, কন্নড়, তেলুগু, মারাঠি, অসমিয়া, গুজরাটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।
বিশেষত্ব
১) তিনি একাধারে একজন সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, কবি, গল্পকার এবং একজন সার্থক আয়োজক ছিলেন।
২) তাঁর গানে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
৩) বাংলা গানে পাশ্চাত্য সংগীতের ব্যবহারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রপথিক।
৪) তিনি প্রথম ‘কয়্যার’ সংগীতের প্রবর্তন করেন।
৫) তিনি প্রকৃত অর্থেই সুরের জাদুকর ছিলেন। সুর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন এবং তাঁর গানে সেগুলি প্রয়োগ করতেন। তাঁর সংগীতপ্রতিভা ছিল বহুমুখী এবং সৃজনশীল।
👉বিভাগ-জ:
✍️প্রবন্ধ রচনা করাে:
১. বেগম রােকেয়া।
২. মহাশ্বেতা দেবী।
৩. সত্যজিৎ রায়।
৪. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
৫. স্বামী বিবেকানন্দ।
৬. জীবনানন্দ দাশ।
................
Presented by
skacademyallinone.blogspot.com

