📚বাংলা মাইনর:1st Semester: আত্মবিলাপ: মধুসূদন দত্ত:প্রশ্নোত্তর📚
ক – বিভাগ | অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর(প্রশ্নের মান-১):
১.আধুনিক বাংলা কবিতার / নাটকের / ট্র্যাজেডি নাটকের / প্রহসনের / সনেটের / অমিত্রাক্ষর ছন্দের / পত্রকাব্যের / মহাকাব্যের জনক কে ?
উত্তর : মাইকেল মধুসূদন দত্ত ।
২.মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতা ও মাতার নাম কী ?
উত্তর : পিতা : রাজনারায়ণ দত্ত এবং মাতা : জাহুরী দেবী ।
৩.মধুসূদনের কয়েকটি কাব্যের নাম লেখ ।
উত্তর : ‘ তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য ’ , ‘ বীরাঙ্গনা কাব্য ‘ , ‘ ব্রজাঙ্গনা কাব্য ‘ , ‘ মেঘনাদ বধ কাব্য ‘ ।
৪.মধুসূদন দত্তের পারিবারিক নাম কী ছিল ?
উত্তর : শ্রী মধুসূদন দত্ত ।
৫.মধুসূদনের ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে কখন ?
উত্তর : হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালে ।
৬.তিনি কোথায় কোথায় অধ্যয়ন করেন ?
উত্তর : হিন্দু কলেজ এবং বিশপস কলেজ ।
৭.মধুসূদন দত্ত কত সালে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন ?
১৮৪৩ , ৯ ফেব্রুয়ারি ।
৮.মধুসূদন দত্ত কতটি ভাষা জানতেন ?
উত্তর : ১৩/১৪ টি ।
৯.মাদ্রাজে থাকাকালীন তিনি কোন কোন ভাষা শিক্ষা করেন ?
উত্তর : সংস্কৃত , গ্রিক , ল্যাটিন , হিব্রু , ফরাসি , তেলেগু , তামিল , জার্মান , ইতালিয়ান ।
১০.মধুসূদন কোন কলেজ থেকে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন ?
উত্তর : বিশপ কলেজ থেকে ।
১১.মধুসূদন মাদ্রাজে অবস্থান করেন কোন সময় ?
উত্তর : ১৮৪৮-১৮৫৬ ।
১২.মাদ্রাজে মধুসূদন কোন পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হন ?
উত্তর : এথিনিয়ম ।
১৩.“ শেক্সপীয়র নিউটন হতে পারে , কিন্তু নিউটন শেক্সপীয়র হতে পারে না । ” – উক্তিটি কার ?
উত্তর : মধুসূদন দত্তের ।
১৪.বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য ‘ মেঘনাদবধ ’ তিনি কত সালে রচনা করেন ?
উত্তর : ১৮৬১ সালে ।
১৫.ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য তিনি বিলাতে গমন করেন কখন ?
উত্তর : ১৮৬৩ সালে ।
১৬.মধুসূদনের দুটি ইংরেজি রচনার নাম লেখ ।
উত্তর : Captive Ladie এবং Vision of the past
১৭.মধুসুদনের ছদ্মনাম কী ?
উত্তর : Temothy Penpoem
১৮.মধুসূদনের প্রথম স্ত্রীর নাম কী ?
উত্তর : রেবেকা ম্যাকটাভিস ( ১৮৪৮ )
১৯.মধুসুদনের ২ য় স্ত্রীর নাম কী ?
উত্তর : হেনরিয়েটা ( ১৮৫৬ ) :
২০.মধুসূদন কী কী প্রহসন রচনা করেন ?
উত্তর : ‘ একেই কী বলে সভ্যতা ‘ এবং ‘ বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ ‘ ।
২১.মধুসূদনের প্রথম নাটকের নাম কী ?
উত্তর : ‘ শর্মিষ্ঠা ‘ ( ১৮৫৯ ) ।
২২.‘ শর্মিষ্ঠা ‘ নাটকটি কোথায় মঞ্চস্থ হয়েছিল ? 22 .
উত্তর : বেলগাছিয়া নাট্যশালায় ।
২৩.মধুসূদন দত্তের রচিত সর্বশেষ নাটকটির নাম কী ?
উত্তর : ‘ মায়া – কানন ‘ ( ১৮৭৪ ) ।
২৪.গ্রিক ও পুরাণের কাহিনি নিয়ে মধুসূদন কোন নাটকটি রচনা করেন ?
উত্তর : ‘ পদ্মাবতী ‘ ।
২৫.‘ শর্মিষ্ঠা ’ ও ‘ পদ্মাবতী ’ নাটক মধুসূদন কোন আদর্শে রচনা করেছিলেন ?
উত্তর : সংস্কৃত আদর্শে ।
২৬ মধুসূদন কোন কোন নাটক সম্পূর্ণ করে যাননি ?
উত্তর : ‘ রিজিয়া ‘ এবং ‘ সুভদ্রা ‘ ।
২৭.মধুসূদন দীনবন্ধু মিত্রের কোন নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ?
উত্তর : ‘ নীলদর্পণ ‘ ( The Indigo Planting Mirror )
২৮.মধুসূদন কোন ছদ্মনামে ‘ নীলদর্পণ ‘ নাটকটি অনুবাদ করেছিলেন ?
উত্তর : A Native
২৯.বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং সার্থক মহাকাব্যের নাম কী ?
উত্তর : ‘ মেঘনাদ বধ ‘ ( ১৮৬১ ) ।
৩০.মধুসূদন কোথায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ?
উত্তর : আলীপুর হাসপাতাল ( ১৮৭৩ , ২৯ জুন )
৩১.‘ আত্মবিলাপ ’ কবিতাটি কত স্তবকে বিভক্ত ?
উত্তর : ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতাটি ৭ টি স্তবকে বিভক্ত ।
৩২.কবি মধুসূদন কিসে ভুলে ছিলেন ?
উত্তর : আশার ছলনে ।
৩৩.কবি কী ভাবেন মনে ?
উত্তর : আশার ছলনে ভুলে কি ফল লাভ করলেন ।
৩৪.জীবন – প্রবাহ কোন দিকে বয়ে যায় ?
উত্তর : কাল সিন্ধু পানে ।
৩৫.কবি কাকে ফেরানোর কথা বলেছেন ?
উত্তর : জীবন – প্রবাহ ।
৩৬.কবির দিন দিন কী ফুরিয়ে যায় ?
উত্তর : আয়ু এবং বল ।
৩৭.কবির আয়ু এবং বল শেষ হলেও কীসের নেশা ছোটে না ?
উত্তর : আশার নেশা ।
৩৮.কবি ‘ আত্মবিলাপ ’ কবিতায় কাকে জাগার কথা বলেছেন ?
উত্তর : নিজের প্রমত্ত মনকে ।
৩৯.কবির জীবন উদ্যানে কী ফুরিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ ?
উত্তর : যৌবন কুসুম ভাতি ।
৪০.নিত্য কী ঝলমল করে না ?
উত্তর : নীর – বিন্দু দুর্বাদলে ।
৪১.কার কোনো সুখ নেই ?
উত্তর : নিশার – স্বপন সুখে যে সুখী ।
৪২.কে শুধু আঁধার বাড়ায় ?
উত্তর : ক্ষণপ্রভা । মরীচিকা মরুদেশে কী হয় ?
উত্তর : নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে ।
৪৩.পথিককে ধাঁধায় ফেলে কিসে ?
উত্তর : ক্ষণপ্রভা ।
৪৪.কবি ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতায় কোন তিন হলের কু – আশার কথা বলেছেন ?
উত্তর : নিশার স্বপ্ন , ক্ষণপ্রভা এবং মরুদেশের মরীচিকা ।
৪৫.কবি কী সাধ করে চরণে পরেছিলেন ?
উত্তর : প্রেমের নিগড় ।
৪৬.কবি কাল ফাঁদে কিসের লোভে উড়ে পড়েছিলেন ?
উত্তর : জ্বলন্ত পাবক শিখা লোভে ।
৪৭.কবি কার মতো ধেয়ে চলেছিলেন ?
উত্তর : পতঙ্গের মতো ।
৪৮.কবির মতে কী অন্বেষণ করা বৃথা ?
উত্তর : কবির মতে অর্থ অন্বেষণ করা বৃথা ।
৪৯.কবির হাত ক্ষত কেন ?
উত্তর : কমল তুলতে গিয়ে মৃণাল কণ্টকে ।
৫০.কবি কোন বিষমজ্বালা ভুলতে পারেন না ?
উত্তর : ফণীর দংশন জ্বালা ।
৫১.কবির আয়ু কীভাবে শেষ হয়েছে কিংবা ব্যয় করেছেন ?
উত্তর : যশোেলাভে ।
৫২.অন্ধ কীট কোথায় ধেয়ে চলে ?
উত্তর : সুগন্ধ কুসুম গন্ধে ।
৫৩.কবি অনাহারে , অনিদ্রায় কী লাভ করতে চেয়েছিলেন ?
উত্তর : যশোলাড ।
৫৪.কে কামড় দেয় অনুক্ষণ ?
উত্তর : মাৎসর্য বিষদশন ।
৫৫.ধীবর অতল জলে কেন ডুব দেয় ?
উত্তর : মুক্তার লোভে ।
৫৬ আশার কুহক হলে কী হারিয়েছেন ?
উত্তর : শতমুক্তাধিক আয়ু ।
৫৭.কালসিন্ধু জলতলে কবি কী হারিয়েছেন ?
উত্তর : শতমুক্তাধিক আয়ু ।
৫৮.‘ আত্মবিলাপ কবিতার প্রথম চরণ কী ?
উত্তর : “ আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায় ” ।
৫৯.‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতার শেষ চরণ কী ?
উত্তর : “ হায় রে , ভুলিবি কত আশার কুহক – ছলে ” ।
৬০.‘ লভিনু ‘ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : লাভ করলাম ।
৬১.‘ সিন্ধু ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ সিন্ধু ‘ শব্দের অর্থ সাগর ।
৬২.‘ আয়ুহীন ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ আয়ুহীন ‘ শব্দের অর্থ আয়ুক্ষয় ।
৬৩.‘ প্রমত্ত ‘ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ প্রমত্ত ‘ শব্দের অর্থ উন্মাতাল ।
৬৪.‘ জীবন – উদ্যানে ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : জীবনের খেলাঘরে ।
৬৫.‘ ভাতি ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : আলো , প্রদীপ ।
৬৬.‘ নীর ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ নীর ‘ শব্দের অর্থ পানি , জল ।
৬৭.‘ অম্বুবিন্দু অম্বুমুখে সদ্য : পাতি ‘ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন ?
উত্তর : জল সর্বদা সাগরের দিকে ধেয়ে যায় ।
৬৮.‘ ক্ষণপ্রভা ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : বিদ্যুৎ , বিজলি ।
৬৯.‘ নিগড় ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ নিগড় ‘ শব্দের অর্থ খাঁচা ।
৭০.‘ পাবক – শিখা ‘ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : আগুনের শিখা ।
৭১.‘ মৃণাল ‘ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর: ফুলের বোঁটা ।
৭২.‘ মাৎসর্য – বিষদমান ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ইন্দ্রিয়ের দংশন ।
৭৩.‘ ধীবর ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : ‘ ধীবর ’ শব্দের অর্থ জেলে ।
৭৪.‘ কুহক – ছলে ’ শব্দের অর্থ কী ?
উত্তর : কুহেলিকার ছলনায় ।
✍️প্রশ্নের মান-১০:
প্রশ্না: ‘ আত্মবিলাপ ’ কবিতায় কবি আশার ছলনে ভুলে কী উপলব্ধি করেছেন ?
উত্তর : মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে নিজ দেশ , ধর্ম , সংস্কৃতি ও ভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম , সংস্কৃতি ও ভাষাকে বরণ করেছিলেন । কিন্তু অচিরেই তাঁর ভুল ভেঙে যায় । তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন যে তাঁর এ উচ্চাশা পোষণ অনুচিত ছিল । আশার পিছনে কালক্ষেপণ করে কবি যে করুণ জীবন – অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতায় তারই প্রকাশ ঘটেছে । আশার ছলনায় ভুলে কবি জীবনের অমূল্য সময় ব্যয় করেছেন । যখন তিনি জীবনের এ ফাঁকিটুকু বুঝতে পেরেছেন তখনই প্রশ্ন তুলেছেন
“ আশার ছলনে ভুলি , কী ফল লভিনু , হায় ,
তাই ভাবি মনে ?
জীবন – প্রবাহ বহি কালসিন্ধু পানে ধায়
ফিরাব কেমনে ?
দিন দিন আয়ুহীন হীন বল দিন দিন ,
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না , একী দায় ! ”
এ প্রশ্নের সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে , জীবনের প্রধান উপকরণ যে যৌবন তাওতো ফুরিয়ে যাচ্ছে । নিজের প্রমত্ত মনকে ধিক্কার দিয়ে তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেছেন ……
রে প্রমত্ত মন মম ! কবে পোহাইবে রাতি ?
জাগিবি রে কবে ?
“ জীবন – উদ্যানে তোর যৌবন – কুসুম ভাতি
কতদিন রবে ? ”
দুর্বাদলের নীরবিন্দুর মতো ক্ষণস্থায়ী জীবন যে কোন সময় শেষ হয়ে যাবে । আশা মানুষকে স্বপ্ন দেখায় । কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে কেবল কাঁদতেই হয় । বিদ্যুৎ যেমন পথিককে ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করে ধাঁধায় ফেলে ; মরীচিকা কেবল পথিককে যেমন জলের আশায় বিচলিত করে তেমনি আশারূপী মরীচিকা মানুষের জীবনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দিকভ্রান্ত করে রাখে ।
প্রশ্ন: “ দিন দিন আয়ুহীন , হীন বল দিন দিন , তবু এ আশার নেশা ছুটিল না , একী দায় । ” কবি কোন প্রসঙ্গে , কেন এমন বলেছেন ?
উত্তর : মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতায় আশারূপী ছলনার ফাঁদে পড়ে মানুষ কীভাবে জীবনের আয়ু শেষ করে ফেলে তা এ চরণসমূহে উপস্থাপন করেছেন । মানুষের জীবন বড্ড ক্ষণস্থায়ী । একটি নির্দিষ্ট সময় পরে মানুষকে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয় । শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কর্মচাঞ্চল্যের ভিতর দিয়ে মানুষ জীবন অতিবাহিত করে থাকে । প্রত্যেক মানুষ তার জীবনের সফলতা কামনা করে । সে হতে চায় যশ , খ্যাতি , অর্থ ও বিত্তের অধিকারী । আশারূপী মরীচিকা মানুষের মনে এ স্বপ্ন জাগিয়ে রাখে । কিন্তু আশার পশ্চাতে ছুটে ছুটে মানুষ বৃক্থা সময় নষ্ট করে । সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় । তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে- যে জীবন বয়ে যাচ্ছে কাল সিন্ধু পানে , তা কি আর কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব ? এ প্রশ্ন যখন মানুষ নিজে নিজেকে করে তখন তার আয়ু শেষ ; যৌবন কুসুম ভাতি তখন মলিন ও অস্পষ্ট । এ সময়ে সে হয়ে পড়ে হীন বল এক অকর্মণ্য জীব । কিন্তু তবু তার আশার নেশা ছোটে না । নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চায় সে । কিন্তু এস্বপ্ন যে মরীচিকা তা সে বুঝতে চায় না । দিনে দিনে তার আয়ু শেষ হতে থাকে । শরীরের শক্তি শেষ হতে থাকে । মন বিষণ্নতায় ভরে উঠে । তখন আক্ষেপ করা ছাড়া তার আর কোন উপায় থাকে না । তবুও আশার ছলনার জাল থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে না । মানুষ তার কর্মজীবনে আশার নেশায় পাগল হয়ে মরীচিকার পিছনে ছুটতে ছুটতে আয়ু শেষ করে ফেলে । তবুও সে এ আশার কুহক থেকে মুক্তি পায় না । কারণ আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে ।
প্রশ্ন: “নারিলি হরিতে মণি , দংশিল কেবল ফণী এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি , মন , কেমনে । ” — ব্যাখ্যা করা ।
উঃ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘আত্মবিলাপ’ কবিতায় অর্থ সম্পদ লাভ করতে গিয়ে মানুষকে যে হতাশার গ্লানিতে নিমগ্ন হতে হয় সে সম্পর্কে কবি উল্লিখিত মন্তব্য করেছেন ।
আশা মানুষকে নিত্য নিয়ত সামনের দিকে নিয়ে যায় । মানুষ দুর্বার গতিতে আশার পিছনে পিছনে ছুটে চলে । অর্থ , যশ ও প্রতিষ্ঠার লোভে সে ব্যাকুল হৃদয়ে ধাবমান হয় । কিন্তু ফুল তুলতে গিয়ে কেবল কাঁটার আঘাতে রক্তাক্ত হয় তার হাত ফুলের সন্ধান সে পায় না । মানুষ আশার ছলনায় ভুলে সাপের মাথার মূল্যবান মণি আহরণের জন্য হাত বাড়ায় । কিন্তু মণির বদলে সাপের দংশনে তার সর্বশরীর বিষময় হয়ে উঠে । এ বিষের যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে তখন তাকে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে হয় । যে সুখের আশায় সে সারাটা জীবন মরীচিকার পিছনে ছুটে সে সুখ নামের সোনার হরিণটির সন্ধান সে পায় না । তখন ব্যর্থতার আক্ষেপে তার অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠে । আত্মবিলাপের আহাজারিতে তার সমস্ত আকাশ মুখরিত হয় । সুখের বদলে জীবনে নেমে আসে দুঃখের তীব্র দহন । এ দহন বিষজ্বালার মতো তাকে কুরে কুরে খায় । এ জ্বালাকে আর হজম করা সম্ভব হয় না । তাকে ভুলতে পারে না সে ।আশা মানুষকে সারাজীবন ঘুরিয়ে মারে । অবশেষে আশা পূরণ না হবার যন্ত্রণা বিষময় হয়ে উঠে । তখন আক্ষেপ করা ছাড়া তার কোন উপায় থাকে না । তার প্রমত্ত মন বিষের জ্বালায় জর্জরিত হতে থাকে ।
প্রশ্ন: “ নীরবিন্দু দুর্বাদলে , নিত্য কিরে ঝলমলে ? কে না জানে অম্বুবিম্ব অম্বুমুখে সদ্যঃপাতি ? ” – প্রসঙ্গ উল্লেখপূর্বক ব্যাখ্যা কর ।
উঃ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘ আত্মবিলাপ ’ শীর্ষক কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে ।
মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা কবি উপমাসহকারে ব্যক্ত করেছেন ।
আশা মানুষের জীবনের প্রধান নিয়ামক শক্তি । আশা আমাদের হৃদয়ে প্রেরণার দীপ হয়ে জ্বলে । এ আশাই মানুষকে সম্মুখের দিকে চলতে শেখায় । আশা না থাকলে মানুষের জীবন গতিহীন হয়ে পড়ত । মানুষ এ কারণে আশায় বুক বেঁধে বাঁচে এবং নিয়ত আশার পিছনে ছোটে । এভাবে তার প্রমত্ত মন ছুটতে ছুটতে গতায়ু হয়ে পড়ে । মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী । চিরকাল বেঁচে থাকে না সে । জীবনের নেই কোন নিশ্চয়তা । দুর্বাদলের পাতার উপরস্থিত জলবিন্দু যেমন যে কোন মুহূর্তে নাড়াচাড়া লেগে পড়ে গিয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে যায় মানুষের জীবনটাও তদ্রূপ । জল ভর্তি করার সময় কলসীর মুখে যে বুদ বুদ সৃষ্টি হয় তার যেমন কোন স্থায়িত্ব নেই মানুষের জীবনেরও তেমনি কোন নিশ্চয়তা নেই । মানুষের জীবন অনন্তকালের পটভূমিতে ঐ দুর্বাদলের জলবিন্দু ও কলসীর বুদবুদের মতই ক্ষণস্থায়ী । অথচ এ চরম সত্যটি জানা থাকা সত্ত্বেও মানুষ আশার পিছনে ছুটে ছুটে জীবন – যৌবন শেষ করে চলেছে । জীবনের শেষ স্তরে এসে সে যখন লাভ – লোকসানের হিসেবে বসে তখন আক্ষেপ করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না তার । তখন আত্ম – বিলাপে মুখরিত হয় তার অন্তরাত্মা ।
জীবন নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী । শিশিরের মতই নিঃশব্দে জীবনটা কালের পটভূমিতে বিলীন হয়ে যায় । প্রতি নিয়ত জীবনের আয়ু শেষ হতে থাকে ।
প্রশ্ন: “ ফিরি দিবে হারাধন কে তোরে , অবোধ মন , হায়রে , ভুলিবি কত আশার কুহক ছলে ? ” — ব্যাখ্যা কর ।
উঃ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘ আত্মবিলাপ ‘ শীর্ষক কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে ।
আশার পিছনে ছুটে মানুষ জীবনের যে অমূল্য ধন হারিয়ে ফেলে তাকে কেউ আর ফিরিয়ে দেয় না বলে কবি এ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ।
মানুষের জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী । পদ্মপত্রের নীরের মতোই যে কোন সময় তার জীবন শেষ হয়ে যাবে । কিন্তু এ চরম সত্যটি জানা থাকা সত্ত্বেও মানুষ আশার কুহকে ভুলে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করে । ডুবুরি যেমন অতলসমুদ্রে মণিমুক্তা সন্ধানের আশায় ডুব দিতে দিতে মুক্তাধিক মূল্যাবান আয়ুকে হারিয়ে ফেলে মানুষও তেমনি আশার পিছনে ছুটতে ছুটতে জীবনকে শেষ করে দেয় । মানুষও তার মনের অজান্তে আশারূপী মরীচিকার পিছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের আয়ু শেষ করে ফেলে । তবুও সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ ছুটতেই আছে । তার এ ছোটাছুটির যেন শেষ নেই । আশার পিছনে ছুটে যে আয়ু সে ক্ষয় করে তা যে আর কোনদিন ফিরে পাওয়া যাবে না— এ কথা মানুষ ভুলে যায় । অবশেষে যখন জীবন প্রদীপ নিবুনিবু হয়ে আসে তখন সে অনুশোচনার অঙ্গারে পুড়ে মরতে থাকে । আক্ষেপ ও বিলাপে তার অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠে । চরম হতাশা তখন তার জীবনকে রুদ্ধ করে ফেলে । মানুষের অবুঝ মন তখন আর হারানো সময় ফিরে পায় না ।
সময় অমূল্য সম্পদ । আশার পিছনে ছুটে ছুটে মানুষ জীবনের যে অমূল্য সময় নষ্ট করে তা আর কোনদিন সে ফিরে পায় না ।
প্রশ্ন: “ মরীচিকা মরুদেশে , নাশে প্রাণ তৃষা ক্লেশে , এ তিনের ছলসম ছলরে এ কু – আশার । ” তা ব্যাখ্যা কর ।
উঃ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘ আত্মবিলাপ ‘ শীর্ষক কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে ।
রাত্রের স্বপ্ন , বিদ্যুতের ঝিলিক আর মরীচিকার সাথেই আশা তুলনীয় । আশার এ স্বরূপ উদ্ঘাটন করে কবি উল্লিখিত উক্তি করেছেন এবং এ তিনটি ছলনাই যেন মানবজীবনকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে তা কবি ব্যক্ত করেছেন ।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী । এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষ নিত্যনিয়ত সুখের সন্ধানে ফেরে । সুখের সন্ধান করতে গিয়ে সে পড়ে আশার কুহকে । আশার নিগড়ে বন্দী মানুষ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সোনার হরিণ লাভের আশায় ছুটতে থাকে । শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে আক্ষেপে ফেটে পড়ে । তখন তার কাছে আশার স্বরূপটি ধরা পড়ে । আশার এ স্বরূপ সম্পর্কে কবি বলেছেন-
নিশার স্বপন সুখ সুখী যে কী সুখ তার ?
জাগে সে কাঁদিতে !
ক্ষণপ্রভা প্রভা দানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
পথিকে ধাধিতে ।
মরীচিকা মরুদেশে নাশে প্রাণ তৃষা ক্লেশে ;
এ তিনের ছলসম ছলরে এ কু – আশার।
অর্থাৎ আশা রাতের স্বপ্ন , বিদ্যুতের আলো আর মরুভূমির মরীচিকার মতো । রাতের স্বপ্ন যেমন স্বপ্ন দ্রষ্টাকে কাঁদায় , বিদ্যুতের আলো যেমন পথিককে কেবল ধাঁধার মধ্যে ফেলে এবং মরুভূমির মরীচিকা যেমন তৃষ্ণার্তের প্রাণনাশ করে আশাও তেমনি মানুষকে হতাশার আগুনে পুড়িয়ে মারে । এ তিন জিনিসের ছলনার মতোই আশার ছলনা মানুষকে বিভ্রান্ত করে । কু – আশার বেড়াজালে আবদ্ধ মানুষ জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে হাহুতাশ করে মরে । হতাশার গ্লানি মানুষকে তখন বিলাপ বিভোর করে তোলে । মন্তব্য : আশা মানুষের জীবনের নিয়ামক শক্তি হলেও কু – আশা তার জীবনকে ভুল পথে টেনে নিয়ে যায় । কু – আশা থেকে মানুষকে তাই দূরে থাকতে হবে ।
প্রশ্ন: “ পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায় , ধাইলি অবোধ , হায় ! না দেখিলি , না শুনিলি , এবে রে পরাণ কাঁদে ! ” — ব্যাখ্যা কর । –
উঃ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘ আত্মবিলাপ ’ কবিতা থেকে চয়ন করা হয়েছে ।
মহাকবি এখানে আগুনের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে আগুনের দিকে ধাবমান নির্বোধ পতঙ্গের সাথে মানুষের তুলনা করে এ কথা বলেছেন ।
মানুষ আশায় বসত করে । আশায় বুক বেঁধে সে সামনের দিকে এগিয়ে যায় । আশা তাকে প্রলুব্ধ করে সর্বদা ব্যস্ত রাখে । আশার ভেলায় চড়ে মানুষ জীবন সমুদ্রে পাড়ি জমায় । কিন্তু আশা যে কেবল তাকে মরীচিকার মতো ঘুরিয়ে মারে সে তা বুঝতে চায় না । প্রেম পাগল মানুষ সম্পর্কে কবি তাই উপমাসহকারে বলেছেন
“ প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাধে ;
কী ফল লভিলি ?
জ্বলন্ত পাবক শিখা লোভে তুই কাল ফাঁদে
উড়িয়া পড়িলি ? ”
অর্থাৎ প্রেমের শিকল পায়ে পরে মানুষ কেবল নিষ্ফল জীবন লাভ করে এবং জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে জ্বলে পুড়ে মরে । আগুনের শিখার সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে কীটপতঙ্গ আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দেয় । সৌন্দর্য – পিপাসু পতঙ্গ নির্বোধের ন্যায় আগুনের তাপে যেমন দগ্ধীভূত হয় মানুষও তেমনি যশ , মান , খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার লোভে আশারূপী আগুনের মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে নিজের সবকিছুকে হারায় । যখন সে এ অর্থহীন উন্মাদনার পরিণাম বুঝতে পারে তখন আর প্রতিকারের পথ খোলা থাকে না । তখন তার অন্তরাত্মা আক্ষেপে ফেটে পড়ে আর করুণ আত্মবিলাপে চারদিকে বেদনার্ত করে তোলে । কুহকিনী আশা মানুষের সবকিছু গ্রাস করে এমনিভাবে ঘুরিয়ে মারে ।
আশা আগুনের মতোই সৌন্দর্যময়ী । তাই পতঙ্গের মতো মানুষ আশার আগুনে দগ্ধীভূত হয়ে জীবনকে শেষ করে ফেলে।
✍️রচনামূলক প্রশ্নাবলি:(প্রশ্নের মান-১০):
প্ৰশ্ন : আত্মবিলাপ ' কবিতার মূলবক্তব্য তোমার নিজের ভাষায় লিখ।
অথবা, “ আশার পিছনে কালক্ষেপণ করে কবি যে করুণ জীবন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ‘ আত্মবিলাপ — কবিতায় তারই প্রকাশ ঘটেছে । ” – এ উক্তির আলোকে কবিতাটির মূল বক্তব্য তোমার নিজের ভাষায় লিখ ।
অথবা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘ আত্মবিলাপ ' কবিতা অবলম্বনে কবির মর্মবেদনার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর ।
অথবা, আত্মবিলাপ ' কবিতা যন্ত্রণাপীড়িত কবির মর্মান্তিক আর্তনাদ । ” – উক্তিটির যথার্থতা যুক্তিসহ বিচার কর
অথবা, আত্মবিলাপ ' কবিতা অবলম্বনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনবোধের স্বরূপ আলোচনা কর
অথবা, গীতি কবিতা হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ' আত্মবিলাপ ' – এর সার্থকতা বিচার কর ।
উত্তর : ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ( ১৮২৪-১৮৭৩ ) আত্মোপলব্ধির চরম প্রকাশ বিশেষ । মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ব্যক্তিগত জীবনে উচ্চাশার বশবর্তী হয়ে নিজ দেশ , ধর্ম , সংস্কৃতি ও ভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্ন ধর্ম , সংস্কৃতি ও ভাষাকে বরণ করেছিলেন । কিন্তু অচিরেই তাঁর ভুল ভেঙে যায় । তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন যে তাঁর এ উচ্চাশা পোষণ অনুচিত ছিল । নিজের বিস্তৃত জীবনের ব্যর্থতার কারণসমূহ তিনি এ কবিতায় আক্ষেপের সাথে ব্যক্ত করেছেন । আশাবাদী মানুষের জীবন যন্ত্রণার স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে কবিতাটির প্রতি চরণে চরণে । জীবন – দর্শন এ কবিতার সবখানি জুড়ে আছে । জীবনবোধ এখানে প্রবলভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে ।
আশার পিছনে কালক্ষেপন করে কবি যে করুন জীবন – অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ‘আত্মবিলাপ’ কবিতায় তারই প্রকাশ ঘটেছে। আশার ছলনায় ভুলে কবি জীবনের অমূল্য সময় ব্যয় করেছেন। যখন তিনি জীবনের এ ফাঁকিটুকু বুঝতে পেরেছেন তখনই প্রশ্ন তুলেছেন –
“আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু, হায়,
তাই ভাবি মনে?
জীবন-প্রবাহ বহি কালসিন্ধু পেইন ধায়
ফিরাব কেমনে ?
দিন দিন আয়ুহীন, হীন বল দিন দিন ,……
তবু এ আশার নেশা ছুটিলনা, একি দায় !”
এ প্রশ্নের সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের প্রধান উপকরণ যে যৌবন তাওতো ফুরিয়ে যাচ্ছে। নিজের প্রমত্ত মনকে ধিক্কার দিয়ে তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেছেন-
“রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাত্রি ?
জাগে ফিরে কবে ?
জীবন-উদ্যানে তোর যৌবন-কুসুম ভাতি
কতোদিন রবে ?”
দুর্বাদলের নিরবিন্দুর মতো ক্ষণস্থায়ী জীবন যে কোন সময় শেষ হয়ে যাবে। আশা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে কেবল কাঁদতেই হয়। বিদ্যুৎ যেমন পথিককে ক্ষনিকের জন্য আলোকিত করে ধাঁধায় ফেলে ; মরীচিকা কেবল পথিককে যেমন জলের আসায় বিচলিত করে তেমনি আশারূপী মরীচিকা মানুষের জীবনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দিকভ্রান্ত করে রাখে। প্রেমের নিকুঞ্জ রচনা করতে গিয়ে মানুষ নিজের পায়ে শৃঙ্খল পরাই ,পতঙ্গের ন্যায় আগুনে ঝাঁপ দেয়,ফুল তুলতে গিয়ে কেবল কাটার আঘাত পাই ,কিন্তু অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। মনির সন্ধান করতে গিয়ে সর্পদংশন হয়ে মরণ যন্ত্রনায় ভোগ করতে হয় মানুষকে। কবি দিকভ্রান্ত মানুষের মতোই খ্যাতির লোভে ছুটে বেড়িয়েছেন ,কীন্তু সফলকাম হতে পারেননি। তখন আক্ষেপ করে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছেন –
“যশোলাভ লোভে আয়ু কতযে ব্যয়িলি হয়,
কব তা কাহারে ?
সুগন্ধ কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধাঁই
কাটিতে তাহারে,
মাৎসর্য-বিশদশন, কামড়েরে অনুক্ষণ !
এই কি লভিলি লাভ , অনাহারে অনিদ্রায় ?”
এই কী লভিলি লাভ , অনাহারে অনিদ্রায় ? ” মুক্তার লোভে ডুবুরি অতল জলে ডুব দিতে দিতে মহামূল্যবান আয়ু ফুরিয়ে ফেলে কিন্তু মুক্তা পায় না । মানুষও তেমনি আশার কুহকে ভুলে গতায়ু হয়ে পড়ে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বস্তুর সন্ধান পায় না । কবি ডুবুরির ন্যায় সারাজীবন যত্রতত্র লাভের আশায় ডুবে ফিরেছেন । কিন্তু লাভ করতে পারেননি কিছুই । শেষ জীবনে দাঁড়িয়ে তাই তিনি নিজের প্রমত্ত মনের কাছে প্রশ্ন করেছেন । এ প্রশ্নের উত্তর তিনি তাঁর প্রশ্নের মধ্যেই রেখে গিয়েছেন । জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে বিলাপ করতে বাধ্য করেছে । ব্যর্থ জীবনের দুর্বহ বোঝা বয়ে বেড়ানোই তাঁর সার হয়েছে । আশার পিছনে ছোটায় ভুলের মাশুল গুনতে গুনতে তিনি আজ ক্লান্ত শ্রান্ত ও বিধ্বস্ত । যে আশার পিছনে তিনি সারাটা জীবন ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই আশা পরিণামে দুঃখ ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি তাঁকে । কবির এ তিক্ত ও নির্মম জীবন অভিজ্ঞতাই ‘ আত্মবিলাপ ‘ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে । আশার মোহপাশে পড়ে মানুষ জীবনের অমূল্য সময় ক্ষয় করে ফেলে । সহজলভ্য সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে সোনার হরিণ পাওয়ার আশায় অনবরত ছুটে ছুটে যখন তার আয়ু শেষ হয়ে যায় তখন বিলাপ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তার । সুতরাং আশারূপী ছলনার কাছ থেকে দূরে থাকা সকলের একান্ত কর্তব্য ।

