📚 মাধ্যমিক বাংলা: প্রলয়োল্লাস: কাজী নজরুল ইসলাম:MCQ+SAQ+DAQ: প্রশ্নোত্তর📚
• MCQ প্রশ্নমান - ১:
১. রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে কৃপাণ শব্দের অর্থ-
(ক) কৃপণ, খ) ছুরিকা (গ) খড়গ, (ঘ) পতাকা।
উত্তর: (গ) খড়্গ।
২. ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় -
(ক) নীল গগনে (খ) নীল আকাশে,(গ) নীল খিলানে,(ঘ) নীল সাগরে।
উত্তর: (গ) নীল খিলানে।
৩. ব্ৰস্ত জটায় দেখা যায় যে বর্ণ-
(ক) লাল, (খ) নীলাভ, (গ) হরিদ্রা, (ঘ) পিঙ্গল।
উত্তর: (ঘ) পিঙ্গল।
৪. নয়নজলের দ্বারা দোল খেয়ে যায়-
(ক) সপ্ত মহাসিন্ধু, (খ) সপ্তসাগর, (গ) সপ্তনদী, (ঘ) হিমালয়।
উত্তর:- (ক) সপ্ত মহাসিন্ধু।
৫. আলো তার ভরবে এবার ঘর। যার আলোয় ঘর ভরবে -(ক) সূর্যের (খ) চন্দ্রের, (গ) ধূমকেতুর (ঘ) উল্কার।
উত্তর: (খ) চন্দ্রের।
৬. উল্কা ছুটায় নীল খিলানে।' 'নীল খিলান’ বলতে বোঝানো হয়েছে -(ক) মহাকাশকে, (খ) প্রাসাদকে (গ) গাছপালাকে,(ঘ) আকাশকে।
উত্তর: (ঘ) আকাশকে।
৭. বিশ্বমায়ের আসন পাতা আছে -(ক) জগতের ওপর,
(খ) মহাবিশ্বের ওপর,(গ) মহাসমুদ্রের ওপর (ঘ) বাহুর ওপর।
উত্তর: (ঘ) বাহুর ওপর।
৮. এবার মহানিশার শেষে কে আসবে?
(ক) পাগল, (খ) স্বরাজ, (গ) ঊষা, (ঘ) লতা।
উত্তর: (গ) ঊষা।
৯. দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর শিশু-চাঁদের কর' কথাটির অর্থ কী? -
(ক) চাঁদের ছোটো সন্তান, (খ) ছোটো চাঁদের হাসি,
(গ) ছোটো চাঁদের কিরণ, (ঘ) চাঁদের ছোটো হাসি।
উত্তর: (গ) ছোটো চাঁদের কিরণ।
১০. তোরা সব জয়ধ্বনি করা'- 'তোরা কারা?
(ক) কুসংস্কারে আচ্ছন্ন দেশবাসী (খ) ছাত্রছাত্রী।
(গ) দেশের যুবসমাজ, (ঘ) প্রবীণদের দল,
উত্তর: (ক) কুসংস্কারে আচ্ছন্ন দেশবাসী।
১১ "আসছে......
জীবন হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।" শূন্যস্থান পূরণ করো-
(ক) বালক,(খ) যুবা,(গ) বৃদ্ধ, (ঘ) নবীন।
উত্তর: (ঘ) নবীন।
১২. 'প্রলয়োল্লাস' শব্দটির অর্থ হল -
(ক) প্রচণ্ড উল্লাস,(খ) ধ্বংসের আনন্দ,(গ) ভয়ংকর রূপ,
(ঘ) রথ ঘর্ঘর।
উত্তর: (খ) ধ্বংসের আনন্দ।
১৩. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় 'চিরসুন্দর হলেন -
(ক) শিব, (খ) কালবৈশাখী,(গ) শক্তি,(ঘ) বিশ্বমাতা।
উত্তর:- (ক) শিব।
১৪ কবি 'নূতনের কেতন' বলেছেন -(ক) কালবৈশাখীর ঝড়কে (খ) অট্টরোলের হট্টগোলকে (গ) রবির বহ্নিজ্বালাকে (ঘ) বিশ্বমায়ের আসনকে।
উত্তর:- (ক) কালবৈশাখীর ঝড়কে।
১৫. দেবতা বাঁধা পড়ে আছে -(ক) নগরে,(খ) বৈকুণ্ঠে (গ) ধ্বংসস্তূপে,(ঘ) যজ্ঞ-যুপে।
উত্তর: (ঘ) যজ্ঞ-যুপে।
১৬. 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর' পঙক্তিটি 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় কতবার আছে ?
(ক) আঠারো,(খ) উনিশ,(গ) কুড়ি (ঘ) একুশ।
উত্তর:- (খ) উনিশ।
১৭. দিগম্বরের জটায় হাসে -
(ক) সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু (খ) শিশু চাঁদের কর (গ) সপ্ত মহাসিন্ধু, (ঘ) দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা
উত্তর: (খ) শিশু চাঁদের কর।
১৮. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটির মুখ্য উপজীব্য হল -
(ক) প্রলয়,(খ) বিপ্লববাদ, (গ) যুদ্ধ, (ঘ) সহমর্মিতা।
উত্তর: (খ) বিপ্লববাদ।
• SAQ প্রশ্নমান - ১:
১. তোরা সব জয়ধ্বনি কর! কবি কাদের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?
উত্তর:- কাজী নজরুল ইসলামের 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় কবি পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী ও স্বাধীনতা-প্রত্যাশী জনগণকে মহাপ্রলয়ের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
২. 'ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর।' ভয়ংকর হাসছে কেন?
উত্তর:- নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় 'ভয়ংকর শব্দটি রূপকার্থে ব্যবহৃত, যার অর্থ ধ্বংসকারী বিপ্লবী সত্তা মহাকালের 'চণ্ডরূপী ভয়ংকর সকল অন্যায়-অত্যাচারকে বিনাশ করে নতুন যুগের সূচনা করার তৃপ্তিতে হাসছেন।
৩. ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর' - 'চরাচর' স্তব্ধ কেন? .
উত্তর:- বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম রচিত 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় ধ্বংসের দেবতা প্রলংকর শিবের অট্টহাসির ভয়ংকর শব্দে বিশ্বচরাচর স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এই স্তব্ধতা মুক্তিকামী মানুষের মনে কোনো এক আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিত বহন করে আনে।
৪. বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকরা' কবি কেন এমন বলেছেন ?
উত্তর:- কবি নজরুল 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় ধ্বংসকামী বিপ্লবী সত্তাকে বিনাশকারী এবং যুগাবসানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে প্রশ্নোদৃত উপমাটি ব্যবহার করেছেন।
৫. 'হাঁকে ওই' - কার হাঁক শোনা যাচ্ছে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় প্রলয়ংকর-রূপী বৈপ্লবিক শক্তির হাঁক বা আহ্বানধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
৬. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় মহাকাল কেমন রূপে আছে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় ধ্বংসকারী মহাকাল-সারথি রক্ততড়িৎ চাবুক হেনে আসছে।
৭. 'ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?" কবি এ প্রশ্ন করলেন কেন?
উত্তর:- প্রলয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুনের বীজ। ধ্বংসের মাঝেই নিহিত আছে নতুন সৃষ্টির হাতছানি। তাই বিনাশ বা ধ্বংসের আগমনে কবি দেশবাসীকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন।
৮. 'আসছে নবীন'-নবীন কে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবি নজরুল 'নবীন' বলতে নবযুগের বার্তাবাহক মহাকাল, ভয়ংকর বা নবীন বিপ্লবী শক্তিকে বুঝিয়েছেন, যাদের হাত ধরে পৃথিবীতে আসবে নতুন যুগ।
৯. বধূরা কেন প্রদীপ তুলে ধরবে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা অনুসারে, যুগান্তরের অন্ধকারের বুক চিরে কাল- ভয়ংকর এগিয়ে আসে মানুষের আকাঙ্ক্ষিত মুক্তিবার্তা নিয়ে। কবি বধূদের প্রদীপ তুলে নিয়ে এই শক্তিকে বরণ করে নিতে বলেছেন।
১০. "আসছে এবার অনাগত প্রলয় নেশার নৃত্য পাগল,' 'নৃত্য পাগল' কে?
উত্তর:- নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় 'নৃত্য পাগল' বলতে, মুক্তিগামী মানুষের বৈপ্লবিক সত্তাকে কবি প্রলয়রূপী নটরাজের নৃত্যপরায়ণ রূপের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১১. ‘ওই আসে সুন্দর'- 'সুন্দর কীভাবে আসে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা অনুসারে 'সুন্দর', 'কাল-ভয়ংকরের বেশে' অর্থাৎ রুদ্ররূপী প্রলয়ের রূপ ধরে আসে।
১২. দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর', 'দিগম্বর' কে?
উত্তর:- কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা থেকে গৃহীত উদ্ধৃতিটিতে 'দিগম্বর বলতে মহাদেবকে বোঝানো হয়েছে।
১৩. এবার মহানিশার শেষে কী ঘটবে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা অনুসারে 'মহানিশার শেষে' অর্থাৎ পরাধীন দেশের অত্যাচার-অপমানের শেষে, ঊষার হাঁসি তথা মুক্তি সূর্যের প্রথম আলোয় জাতির জীবন নতুন করে উদ্ভাসিত হবে।
১৪. 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর।' কার জয়ধ্বনি করতে বলা হয়েছে?
উত্তর:- কবি কাজী নজরুল ইসলাম 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী জনগণকে স্বপ্ন বা আশাপূর্ণকারী প্রলয়ের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।
১৫. ‘দিগম্বরের জটায়' কে হাসে?
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা অনুসারে শিশু চাঁদের স্নিগ্ধ ও মাধুর্যময় হাত যেন দিগম্বর মহাদেবের জটায় হাসে। এই হাসির মধ্যে ফুটে ওঠে সময়রূপী মহাকালের অভয়মন্ত্র।
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
• প্রশ্নমান-৩:
১. “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!- 'তোরা কারা ? তাদের জয়ধ্বনি করতে বলা হচ্ছে কেন?
উত্তর:- নজরুল 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় কবি 'তোরা বলতে পরাধীন দেশের স্বাধীনতার প্রত্যাশী আপামর জনসাধারণকে বুঝিয়েছেন।
ভারতবর্ষের পরাধীনতা কবি নজরুলের কাছে ভীষণ পীড়াদায়ক ছিল। তিনি সর্বদাই এই অবস্থার অবসান চাইতেন। তিনি বুঝেছিলেন কালবৈশাখীর মতো ভয়ংকর শক্তি কিংবা প্রলয়-নেশায় মত্ত মহাদেবের মতোই কেউ এসে এই অবস্থার অবসান ঘটাবে। তাই কবি ভারতীয়দের এই ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতার আগমনের উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি করার আহ্বান জানিয়েছেন।
২. বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর:- 'ভয়ংকর' বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? তার আসার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:- নজরুল তাঁর 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাতে 'ভয়ংকর' বলতে নবযুগের বার্তাবহ প্রলয়রূপী বিপ্লব বা বিদ্রোহকে বুঝিয়েছেন। রুদ্ররূপী শিবকে তিনি এর প্রতীক রূপে কল্পনা করেছেন।
অত্যাচারী ব্রিটিশের শাসনে ভারতবাসী স্থবির হয়ে গিয়েছিল। আর ভারতবর্ষ হয়ে গিয়েছিল অচলায়তন। কালের নিয়মে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটবেই। সেই অচলায়তন ভাঙবে মানুষের সম্মিলিত বিপ্লবের দ্বারা। আশাবাদী কবি আসন্ন বিপ্লবের এই আছড়ে পড়া ঢেউকে ভয়ংকর প্রলয়ের সাঙ্গে তুলনা করেছেন।
৩. 'দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাদের কর - "দিগম্বরের জটা' ও 'শিশু-চাদের কর— এই দুই চিত্রকল্পের মেলবন্ধনের স্বরূপ বুঝিয়ে দাও।
উত্তর:- নজরুল তাঁর কল্পনাশক্তির শিখরে পৌঁছেছেন 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার প্রশ্নোদৃধৃত অংশে। দিগম্বর অর্থাৎ দেবাদিদেব শিবের অন্য এক রূপ হল রুদ্র চণ্ডের সংহারক মূর্তি। অথচ তাঁরই জটায় শোভা বৃদ্ধি করে চাঁদের ছোট্ট একটি ফালি। ঠিক যেন প্রলয়ের ভয়ংকরতার পাশাপাশি প্রতীক্ষায় আছে এক নতুন দিনের স্নিগ্ধ শান্তির হাতছানি। রাতের শেষে যেমন দিন আসে, অঝোর বর্ষণের শেষে দেখা দেয় সোনাঝরা রোদ, তেমনই প্রলয়-শেষে আবির্ভূত হবে মানবমুক্তির স্নিগ্ধ সৌন্দর্য, এই হল কবির বিশ্বাস।
৪. ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?- ধ্বংসকে ভয় না পাওয়ার কারণটি বুঝিয়ে দাও।
উত্তর:- উদ্ধৃতিটি নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার অংশ-বিশেষ। কালের রথে চড়ে মহাপ্রলয়ের মধ্যে দিয়ে মহাকালের বা ভয়ংকরের আগমন দেখে কবি অগ্রদূতকে ভয় না পেতে বলেছেন। প্রলয় ধ্বংসকারী, কিন্তু এটাও সত্য যে প্রলয়ই সৃষ্টির হাতছানি। প্রলয় আমাদের মধ্যে বেদনাবোধ জাগালেও নতুন কিছু সৃষ্টি করে। প্রলয়ই পারে নবচেতনার আলোকে প্রাণহীন অসুন্দরের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে। কবি তাই তার অগ্রদূতকে অভয় দিয়ে বলেছেন প্রলয় চিরসুন্দর। সে ভেঙে আবার গড়তেও পারে। তাই প্রলয়কে ভয় পাবার কিছু নেই।
৫. ‘আসছে নবীন জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন। — উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য লেখো।
উত্তর:- প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা থেকে নেওয়া। পরাধীন ভারতের জীর্ণতা, দাসত্ব, জড়তা, বৈষম্য ও শোষণের অবসান ঘটাতে কবি বৈপ্লবিক সত্তার আগমন ধ্বনি শুনতে পেয়েছেন। প্রলয়-রূপী এই যুগান্তরের শক্তির পদসার দেখে তিনি হয়েছেন আত্মহারা। কবি নিশ্চিত জীবনহারা-অশুভের বিনাশকারী নবীনের মধ্যেই আছে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। সেই পারে নিষ্প্রাণ-গতিহীন সমস্ত কুশ্রীতার জঞ্জালকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে। উপরের উদ্ধৃতিটিতে কবি এ কথাই বলতে চেয়েছেন।
৬. 'এবার মহানিশার শেষে আসবে ঊষা অরুণ হেসে 'মহানিশা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:- 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় কবি নজরুল পরাধীন ভারতের শোষিত ও লাঞ্ছিত স্থিতাবস্থাকে 'মহানিশা অর্থাৎ দীর্ঘ অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কবির বিশ্বাস নিপীড়িত দেশের এই দুর্দশার অন্ধকার ভেদ করে নতুন সকাল আসবে। কারণ প্রলয় আসন্ন। এ প্রলয় মুক্তিকামী দেশবাসীর নবজাগরণের প্রলয়। ফলে ধ্বংসের মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছেন নতুন জীবনের সম্ভাবনা। রুদ্রের ভেতরে যেমন লুকিয়ে থাকে সুন্দর, তেমনই অন্ধকারের শেষে মেলে আলোর উৎস। তাই কবি অন্ধকার রাত্রি শেষে নতুন সূর্যোদয়ের মধুর হাসির আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
• প্রশ্নমান -৫:
১. 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় একদিকে ধ্বংসের চিত্র আঁকা হয়েছে আবার অন্যদিকে নতুন আশার বাণী ধ্বনিত হয়েছে। প্রসঙ্গটি কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।
উত্তর:- কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় যেমন একদিকে ধ্বংস বা প্রলয়ের চিত্র আঁকা হয়েছে অন্যদিকে আবার এক গভীর আশার বাণী ধ্বনিত হয়েছে। একদিকে কালবৈশাখী ঝড়ের দাপটের চিত্র.. অন্যদিকে আসন্ন প্রলয়ের পরেই নতুন দিনের প্রতীক্ষার অবসান— সবমিলিয়ে বিনাশ ও সৃষ্টির চমৎকার মেলবন্ধনে প্রাণিত নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতা। প্রথম কয়েকটি স্তবকে অনাগত প্রলয়ের তাণ্ডবের বর্ণনা পাঠককে ভয়ে বিবশ করে তোলে। সেখানে ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর', অথবা 'জয় প্রলয়ংকর ইত্যাদি বাক্যাংশ ব্যবহার করে, কবি খুব সচেতনভাবে প্রলয়ের ধ্বংসকারী রূপকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। একদিকে "দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়', অন্যদিকে 'বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্তমহাসিন্ধু দোলে- আগুন ও জলের সহাবস্থান একই নয়নে দেখিয়ে কবি এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, অন্ধকারের সঙ্গেই আলো, কালোর সঙ্গেই সাদা ওতপ্রোত ও একাকার। ঠিক এই বার্তাই রূপ পায়, যখন কবি উল্লসিত আবেগে বলে ওঠেন, এবার মহানিশার শেষে আসবে ঊষা অরুণ হেসে' অথবা 'ধ্বংস দেশে ভয় কেন তোর? – প্রলয় নূতন সৃজন বেদনা' কবি জানেন সৃষ্টির বেদনা। তাই মহাপ্রলয়ের শেষে যে নতুন দিনের উদয় অবশ্যই হবে সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত। আশা ও ভীতির দোলাচলে 'প্রলয়োল্লাস' কবিতাটি একটি ছন্দোময় আবেগগীতি।
২. 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর। কাদের উদ্দেশ্যে কবির এই আহ্বান? কবিতার ভাববস্তু বিশ্লেষণ করে এই আহ্বানধ্বনির পুনরাবৃত্তির যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করো।
উত্তর:- উদ্ধৃত অংশটি নজরুলের প্রলয়োল্লাস' কবিতার অংশ বিশেষ। 'তোরা বলতে কবি পরাধীন ভারতের সেইসব মানুষদের বুঝিয়েছেন, যারা ইংরেজদের হাতে অত্যাচারিত, অশিক্ষা, কুংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং চেতনাহীন। তাই তাদের চেতনা জাগ্রত করতে এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনের জন্য ও বিপ্লবী সত্তাকে উজ্জীবিত করার উদ্দ্যেশ্যে কবির এই আহ্বান।
অনুনয়-বিনয় নয়, পরাধীন ভারতকে স্বাধীন করতে চাই তীব্র আন্দোলন। তাই তো তাঁর বিদ্রোহী সত্তা বারবার উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন কারাগারের লৌহকপাট ভেঙে ফেলতে। কখনও বা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা যে দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত সে কথা জানিয়ে তিনি জয়োল্লাস করতে বলেছেন। আশাবাদী কবি তাই বারে বারে প্রলয়কে আহ্বান জানিয়েছেন। এই প্রলয়ই পারে কালবৈশাখীর ঝড় বা মহাকালে চণ্ডরূপে সিন্ধুপারের সিংহদ্বারের আগল ভেঙে বিপ্লবীদের মুক্তি দিতে, জরাগ্রস্ত মুমূর্ষু জাতির মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করতে। কবি মহাপ্রলয়ের এই ধ্বংসলীলা দেখে ভয় না পেতে বলেছেন। কেননা রুদ্ররূপ মহাপ্রলয় একই সাথে ধ্বংস ও সৃষ্টিরও। সেই-ই পারে ধ্বংসের উপর নতুন সমাজ স্থাপন করতে। তাই কবি তাকে বরণ করে নিতে জয়োল্লাস করতে বলেছেন। কবিতায় 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর' চরণটি আঠারো বার উচ্চারণের কারণ এর গীতিময়তা এবং পরাধীন ও প্রায় স্থবিরত্ব প্রাপ্ত অসহায় ভারতবাসীর হৃদয়ে উজ্জীবনের অনুরণন জাগানো।
৩. "কাল- ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর— কাল- ভয়ংকর কে? তার ভয়ংকর রূপের বর্ণনা দাও ও তাকে সুন্দর বলা হয়েছে কেন তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর:- উদ্ধৃতিটি নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস' কবিতার অংশবিশেষ। বিদ্রোহী কবি বিপ্লবের পথেই যে ভারতবাসীর মুক্তি সে-কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁর লেখনীতে তা বেশ স্পষ্ট। কিন্তু প্রায় জীবনহারা অচল-অসাড় একটা জাতিকে উজ্জীবিত করতে চাই একটা মহাপ্রলয়। সেই প্রলয় ঘটাতে পারে একমাত্র রুদ্ররূপী কাল ভয়ংকর। যদিও এক্ষেত্রে কবি দেশের যুবশক্তিকে কাল-ভয়ংকর রূপে আখ্যা দিয়েছেন।
কবি রুদ্ররূপী কাল-ভয়ংকর অর্থাৎ যুবশক্তির বিভিন্ন রূপ বর্ণনা করেছেন। কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল মহাকালের চণ্ডর পে সামাজিক অসংগতিকে দূর করতে তার আগমন ঘটে। কখনও তার ঝামর কেশের দোলায় গগন দুলে যায় এবং তাঁর অট্টহাস্যের চরাচর স্তব্ধ হয়ে যায়। দু-চোখে দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা নিয়ে বিশ্বমায়ের আসনকে সে আগলে রাখে। মাভৈঃ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এই কাল- ভয়ংকর মুমূর্ষুদের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। মহাকালের রথের সারথি হয়ে সে দেবতারূপ বিপ্লবীদের বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে। কবি এই কাল-ভয়ংকরকে ভয় পেতে বারণ করেছেন। কেননা এই ধ্বংসের শেষেই সৃষ্টির নতুন দিগন্ত আমাদের সামনে খুলে যাবে। তাই কবি এই ভয়ংকরকে সুন্দর বলেছেন।
৪. ‘অন্ধ কারার বন্ধ কুপে – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? সেইসঙ্গে ‘দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে/পাষাণ স্তূপে বলার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর:- বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব নজরুলের। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে দেশপ্রেম ও বিপ্লবী সত্তা। দেশমাতাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর ব্রত। লেখনীকেই তিনি তাঁর লড়াইয়ের অস্ত্ররূপে বেছে নিয়েছিলেন। শত চেষ্টাতেও শাসক তাঁর কণ্ঠস্বর রোধ করতে পারেনি। বার বার তিনি তাঁর দেশপ্রেমের জন্য কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় উদ্ধৃত পক্তি 'অন্ধকারার বন্ধ কুপো শব্দবন্ধ ব্যবহার করে একদিকে কবি বিদেশি শাসকের হাতে শৃঙ্খলিত দেশমাতার প্রতীক রূপে কল্পনা করেছেন আবার অন্যদিকে দেশমাতার এই শৃঙ্খল মোচন করার জন্য স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিকদের কারাগারের অন্ধকুপে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যু বরণ করার ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন। এক্ষেত্রে প্রতিবাদী কণ্ঠকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে শাসনের যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র সে-কথা বোঝাতেই শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হয়েছে।
স্বাধীনতার পূজারি বিপ্লবী কবি নজরুলের কাছে পরাধীন দেশের বিপ্লবীরাই হল প্রকৃত দেবতা। কবি এ কথা তাঁর বহু কবিতায় উল্লেখ করেছেন। যজ্ঞের যূপকাষ্ঠে বলি প্রদান করে দেবতাকে সন্তুষ্ট করা হয় কিন্তু এখানে স্বয়ং সেই দেবতাই যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত হবার জন্য বাধা পড়েছেন। এক্ষেত্রে দেবতারূপ বিপ্লবীদের পরাধীন যুগে কারাগারের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে ফাঁসি দেবার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তবে কবির বিশ্বাস মহাকালের সারথি তা হতে দেবে না।
৫. 'আসছে নবীন—জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন।— "জীবনহারা অসুন্দর'-কে ছেদন করতে নবীনের আসার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। 'ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর। – ভেঙে আবার গড়া বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর:- কালের অগ্রগমন ঘটে নতুনের হাত ধরে, এমত শাশ্বত। নজরুল তাঁর 'প্রলয়োল্লাস' কবিতায় নবীনকে বলেছেন 'জরায় মরা মুমুর্ষুদের প্রাণ দিতে। কবি এই কবিতায় যা কিছু প্রাচীন, জরাগ্রস্ত, অগ্রগমনের পথে বাধাস্বরূপ সেসব কিছুকে বিনাশ করতে ধ্বংসকারী মহাকালকে আহ্বান জানিয়েছেন। রুদ্রের কাজ বিশ্বচরাচরে যা কিছু অন্যায়, যা কিছু কদর্য সবকিছুকে ধ্বংস করে নতুনের আগমনকে সূচিত করা। আশাবাদী কবি পরাধীন ভারতীয়দের জীবনহারা অসুন্দর জীবনের ছেদন অর্থাৎ ইতি চেয়ে নবীনকে আহ্বান জানিয়েছেন। কবির বিশ্বাস জীবনহারা অসুন্দরকে ছেদন করতে নবীন আসছে।
প্রকৃতিতে সৃষ্টি ও ধ্বংস পাশাপাশি চলে। ধ্বংসের মধ্যেই সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে থাকে। পুরাতনের ওপরই সঞ্চারিত হয় নতুন প্রাণের। হিন্দু পুরাণ অনুসারে এসব কিছুই ঘটে চলেছে সৃষ্টি-লয়ের দেবতা শিবের ইচ্ছানুসারে। এই চিরসুন্দরের ভাঙাগড়ার খেলা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কবি মহাকালের এই খেলাকেই 'ভেঙে আবার গড়তে জানে' বলে মনে করেছেন।
......................
Presented by
skacademyallinone.blogspot.com

