📚 উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস :অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর:অধ্যায়-২:উনবিংশ ও বিংশ শতকে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রসার।(MCQ+SAQ+DAQ)📚
✍️MCQ প্রশ্নোত্তর [মান ১]:
1.
পর্তুগিজরা ব্ল্যাক গোল্ড বলতো-(a) কয়লাকে
(b) গোলমরিচকে (c) লবঙ্গকে (d) দারুচিনিকে।
Ans.
(b) গোলমরিচকে।
2.ভারতের
কোন রাজ্যে প্রথম ইংরেজরা রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে? (a) বোম্বে (b) গুজরাট (c) মাদ্রাজ (d) বাংলা।
Ans.
(d) বাংলা।
3.
তরমুজের মতো খন্ড খন্ড করে বাটোয়ারা করা হয় কোন দেশকে? (a) জাপান (b) ভিয়েতনাম. (c) চীন (d) দক্ষিণ আফ্রিকা।
Ans.(c)
চীন।
4.
আমেরিকা মহাদেশকে নতুন বিশ্ব’ নামকরণ করেন—(a) কলম্বাস (b) ভাস্কো -দা-গামা (c) আমেরিগো ভেসপুচি (d) কেব্রাল।
Ans.
© আমেরিগো ভেসপুচি।
5.
Colonia যে
শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে তা হলো –(a) ফরাসি
(b) লাতিন (c) জামান (d) ইংরেজি।
Ans.
(b) লাতিন।
6.Realpolitik
– নীতির প্রবক্তা হলেন-(a) কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম (b) বিসমার্ক (c) ট্রুম্যান (d) হিটলার।
Ans.
(b) বিসমার্ক।
7.
কোন দেশের বর্তমান নাম মায়ানমার? (a) সিংহল
(b) ব্রহ্মদেশ (c) বোনিও (d) সুমাত্রা।
Ans.
(b) ব্রহ্মদেশ।
8.শিল্পবিপ্লব
সর্বপ্রথম সংঘটিত হয়—(a) ইংল্যান্ডে
(b) ফ্রান্সে (c) জার্মানিতে (d) ইতালিতে।
Ans.
(a) ইংল্যান্ডে।
9.উদীয়মান
সূর্যের দেশ কোনটি? (a) আমেরিকা (b) চিন (c) জাপান (d) ইংল্যান্ড।
Ans.
© জাপান।
10.
দারুচিনি দ্বীপ কাকে বলা হয়? (a) ইন্দোনেশিয়া
(b) শ্রীলংকা (c) মালয়েশিয়া (d) আন্দামান।
Ans.
(d) শ্রীলংকা।
11.
অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলা হয়—(a) এশিয়াকে
(b) ইউরোপকে (c) আফ্রিকাকে (d) অস্ট্রেলিয়াকে।
Ans.
© আফ্রিকাকে।
12.
‘মার্কেন্টাইলবাদ” কথাটি ব্যবহার করেন-(b) কার্ল মার্কস (c) ভি.
আই. লেনিন (d)
ডেভিড হরোইজ।
Ans.
(a) অ্যাডাম স্মিথ।
13.১৪৯২
খ্রি: আমেরিকা আবিষ্কার করেন-(a) ভাস্কো-দা-গামা
(b) আমেরিগো ভেসপুচি (c) কলম্বাস(d) কেউ নন।
Ans.
(c) কলম্বাস।
14.
Imperialism: A Study’-গ্রন্থটি
রচনা করেন-(a)
লেনিন (b) হবসন (c) অ্যাডাম স্মিথ (d) ডেভিড টমসন।
Ans.
(b) হবসন।
15.
ইয়ান্দাবুর সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়—(a) ১৮২৬
খ্রিস্টাব্দে(b)
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে (c) ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে (d) ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে।
Ans.
(a) ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে।
16.
সগৌলির সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়—(a) ১৮১৬
খ্রিস্টাব্দে (b)
১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে (c) ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে (d) ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে।
Ans.
(a) ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে।
17.নানকিং-এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল—(a)১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে (b) ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে (c) ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে (d) ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে।
Ans.
(b) ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে।
18.
ভারতের কোন রাজ্যে প্রথম ইংরেজরা রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে?
(a)
বম্বে (b) গুজরাট (c) মাদ্রাজ (d) বাংলা।
Ans.
(d) বাংলা।
19.
‘Wealth of Nations’-গ্রন্থটির
লেখক হলেন—(a)
হাসন (b) অ্যাডাম স্মিথ (c) মেকলে (d) লেনিন
Ans.
(b) অ্যাডাম স্মিথ।
20.
আফ্রিকাতে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেছিল—(a) ইংরেজরা (b) ফরাসিরা
(c) পোর্তুগিজরা (d) ওলন্দাজরা।
Ans.
(b) ফরাসিরা।
21.
নয়া সাম্রাজ্যবাদ’ কথাটি কে ব্যবহার করেন?(a) ডেভিড টমসন (b) কার্ল মার্কস (c) আর্নল্ড টয়েনবি (d) লেনিন।
Ans.
(a) ডেভিড টমসন।
22.
কানাডায় উপনিবেশ গড়ে তোলে-(a) স্পেন
(b) ফ্রান্স (c) ইংল্যান্ড (d) ডেনমার্ক।
Ans.
(b) ফ্রান্স।
23.
মার্কেন্টাইলবাদ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন–(a) লর্ড অ্যাক্টন (b) ডেভিড টমসন (c) অ্যাডাম স্মিথ (d) লর্ড মাকেন্টাইল।
Ans.
© অ্যাডাম স্মিথ।
24.
ইম্পেরিয়াম শব্দটি হলো একটি-(a) ফরাসি
শব্দ (b) ল্যাটিন শব্দ (c) গ্রিক শব্দ (d) ইংরেজি শব্দ।
Ans.
(b) ল্যাটিন শব্দ।
25.
আমেরিকা স্বাধীনতা ঘোষণা করে—(a) ১৭৭৬
খ্রি: (b) ১৭৭৭ খ্রি: (c) ১৭৭৮ খ্রিLd) ১৭৭৯ খ্রি:
Ans.
(a) ১৭৭৬ খ্রি:।
✍️অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর [মান ১]:
1. সর্বপ্রথম শিল্পবিপ্লব কোথায় শুরু
হয়েছিল?
Ans.
ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্পবিপ্লবের
সূচনা হয়।
2. কার নেতৃত্বে, কবে বার্লিন চুক্তি
স্বাক্ষরিত হয়?
Ans.
জার্মান চ্যান্সেলর বিসমার্কের
নেতৃত্বে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে বার্লিন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
3. আমেরিকা ছিল কাদের উপনিবেশ?
Ans.
আমেরিকা ছিল ব্রিটিশদের উপনিবেশ।
4. আমেরিকা কবে স্বাধীনতা লাভ করে?
Ans.
১৭৭৬ খ্রি: ভাসাই সন্ধির মাধ্যমে
আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করে।
5. আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে কে নেতৃত্বে
ছিলেন?
Ans.
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে মুখ্য
ভূমিকা নেন জর্জ ওয়াশিংটন।
6. ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ বলতে কী বোঝো?
Ans.
জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম
কর্তৃক অনুসৃত বিশ্ব-রাজনীতির তত্ত্ব ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ বলে চিহ্নিত।
7. লেনিন রচিত সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক একটি
গ্রন্থের নাম লেখো।
Ans.
Imperialism – The Highest Stage of Capitalism.
8. সাম্রাজ্যবাদ কাকে বলে?
Ans.
কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র যখন অন্য কোনো
রাষ্ট্র বা জাতির উপর অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে তাকেই বলে
সাম্রাজ্যবাদ।
9. বাণিজ্যিক পুঁজি কাকে বলে?
Ans.
উৎপাদনের জন্য নয়, কেবলমাত্র
ব্যাবসাবাণিজ্য পরিচালনার জন্য যে পুঁজি কাজে লাগানো হয়, সেটাই বাণিজ্যিক পুঁজি।
ব্যবসায় বাড়তি লাভ হলে এধরনের পুঁজি বাড়ানো সম্ভব।
10.
উপনিবেশবাদ -এর অর্থ কী?
Ans.
Colonialism বা
উপনিবেশবাদ শব্দের উৎস লাতিন শব্দ Colonia। এর অর্থ হলো বিশাল সম্পত্তি বা এস্টেট।
11.
আফ্রিকাকে কেন বলা হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’?
Ans.
উনিশ শতকের মধ্যভাগের আগে পর্যন্ত
আফ্রিকার অধিকাংশ অলই ইউরোপের মানুষের কাছে অচেনা ও অনাবিষ্কৃত ছিল। তাই একে বলা
হতো অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ।
12.
কোন সময়কাল ‘নব সাম্রাজ্যবাদের যুগ’ বলে পরিচিত?
Ans.
১৮৭০-১৯১৪ খ্রি: মধ্যবর্তী পর্যায় নব
সাম্রাজ্যবাদের যুগ হিসেবে পরিচিত।
13.
‘নীলজল নীতি’ কী?
Ans.
পোর্তুগিজ শাসনকর্তা আলবুকার্কের
সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি ‘নীলজল নীতি’ নামে পরিচিত।
14.
‘মুক্ত বাণিজ্য নীতি’-র প্রবক্তাদের কী বলা হতো? এই নীতির অন্যতম সমর্থক কে ছিলেন?
Ans.
ফিজিওক্র্যাটস বলা হতো। এই নীতির
অন্যতম সমর্থক হলেন অ্যাডাম স্মিথ।
15.
‘উপনিবেশবাদ’ কী?
Ans.
কোনো অঞ্চলের বাসিন্দাদের উপর
সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে বিশ্বাসী কোনো শক্তির সার্বভৌম আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকেই বলা হয়
উপনিবেশবাদ।
16.
নির্জোট আন্দোলন কী?
Ans.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া,
আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলি ঠান্ডা লড়াই থেকে দূরে সরে নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য
যে আন্দোলন করে তা নির্জোট আন্দোলন নামে পরিচিত।
17.
কবে, কাদের মধ্যে প্রথম অহিফেন বা আফিমের যুদ্ধ হয়?
Ans.
১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও চিনের
মধ্যে। 1842 খ্রিস্টাব্দে নানকিং সন্ধি দ্বারা এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি
হয়।
18.
কাদের মধ্যে দ্বিতীয় অহিফেন বা আফিমের যুদ্ধ হয়?
Ans.
ব্রিটিশ ও ফরাসি জোটের মধ্যে। তিয়েন
সিনের সন্ধি দ্বারা এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়।
19.
কোন কোন অঞ্চল নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া বা ইস্ট ইন্ডিজ গঠিত হয়?
Ans. জাভা, সুমাত্রা, বালি ও বোর্নিও
দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত হয়।
20.
হবসনের মতে কী কারণে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে?
Ans.
হবসনের মতে, পুঁজিবাদের বণ্টন
ব্যবস্থার ত্রুটির জন্যই সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব হয়।
21.
‘ওয়েলথ অব নেশনস’ কার লেখা?
Ans.
‘ওয়েলথ অব
নেশনস’ রচনা করেন অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ।
22.
ক্যাপ্টেন কুক কোন কোন দেশ আবিষ্কার করেন?
Ans.
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, নিউজিল্যান্ড,
অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ আবিষ্কার করেন ক্যাপ্টেন কুক।
23.
বুল এর নির্দেশ নামা কি?
Ans.
সমুদ্র অভিযানে পর্তুগাল ও স্পেনের
মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে ১৪৯৩
খ্রিস্টাব্দে পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডার পোপের নামাঙ্কিত নির্দেশনামায় স্পেনের
সামরিক অভিযানের এলাকা নির্দিষ্ট করে দেন। একে বলে Papal Bull বা বুলের নির্দেশ নামা।
24.
মুক্তদ্বার নীতি কি?
Ans.
চীনা ভূখণ্ডে ইউরোপীয় দেশগুলোর
উপনিবেশ স্থাপন রোধ করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন হে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে
একটি নীতি ঘোষণা করেন তাতে বলা হয় চীনা ভূখণ্ডে যেকোন দেশের বণিক বা বণিক গোষ্ঠী
অবাধে বাণিজ্য করার অধিকার পাবে। একেই বলা হয় মুক্তদ্বার নীতি।
25. বাণিজ্যিক মূলধন বলতে কী বোঝো?
Ans.
শিল্প বিপ্লবের আগে পুঁজিপতিরা বাণিজ্য
মূলধন বিনিয়োগ করতেন, বাণিজ্যে নিয়োজিত এই মূলধন বাণিজ্যিক মূলধন বাণিজ্যিক
পুঁজি নামে পরিচিত।
26. মার্কেন্টাইল বা বণিকবাদ বলতে কী
বোঝায়?
Ans.
পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে
ইউরোপে একটি বিশিষ্ট অর্থনৈতিক শক্তি আত্মপ্রকাশ করে, মূলত রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও
বাণিজ্যিক দিক থেকে সমৃদ্ধ করার জন্য কিছু নীতি গৃহীত হয়, একেই বলা হয়
মার্কেনটাইল বাদ।
27. লগ্নি পুঁজি কি?
Ans.
শিল্প-বাণিজ্য থেকে অর্জিত অতিরিক্ত
মুনাফা যখন আরও মুনাফা অর্জনের জন্য আবার কোন শিল্পে বা বাণিজ্যে বিনিয়োগ করা
হয়, তখন তাকে লগ্নিপুঁজি বলে।
28. সাদা চামড়ার দায়বদ্ধতা বা
শ্বেতাঙ্গদের বোঝা কি?
Ans.
ইংরেজি লেখকের রুডিয়ার্ড কিপলিং এবং
ফরাসি লেখক জুলি ফেরি প্রমূখ শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও
বাহক বলে মনে করত, সেজন্য তারা পৃথিবীর অনুন্নত কৃষ্ণাঙ্গ জাতি গুলিকে সুসভ্য করার
নৈতিক দায়িত্ব পালন করার জন্যই এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনুন্নত অঞ্চলে
আধিপত্য বিস্তার করে তাদের এই ধরনের চিন্তাধারা কে বলা হয় সাদা চামড়ার
দায়বদ্ধতা। এটি আসলে ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের
একটি অজুহাত মাত্র।
29. বর্ণ বৈষম্য নীতি কি?
Ans.গায়ের রং এর ভিত্তিতে যখন কোন দেশে
কোন স্থানে বিভিন্ন ক্ষেত্রেবৈষম্য করা হয় একেই বলা হয় বর্ণবৈষম্য নীতি। দক্ষিণ আফ্রিকা-ভারত ইত্যাদির মতো দেশে
বলবৎ হয়।
✍️রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর [ মান ৮ ]:
1. ঔপনিবেশিক সমাজে জাতি সংক্রান্ত প্রশ্ন ও তার প্রভাব আলোচনা করো।
অথবা, জাতিবৈষম্য বলতে কী বোঝো? ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে জাতিবৈষম্যের প্রভাবগুলি লেখো।
সূচনা: ভৌগােলিক আবিষ্কারের সুবাদে ভারতবর্ষে প্রথমদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য করতে এলেও পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল।
[1] গোড়ার কথা:
গ্রাম: প্রাক-ব্রিটিশ ভারতের গ্রামে কৃষক ছাড়া ছুতাের, কুমাের, মুচি, ধােপা, তেলি, নাপিত এবং অন্যান্য কারিগররা বাস করত। গ্রামীণ সমাজের মধ্যে নিম্নশ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। এসময় ভারতের গ্রামগুলির অধিবাসীরা জাত ব্যবস্থাকে দেবতাদের আদেশ হিসেবে গণ্য করত। জাত প্রথার সমস্ত ধরনের আচার ও বিধিনিষেধ তারা মুখ বুজে মেনে নিত।
শহর: প্রাক্-ব্রিটিশ ভারতের শহরগুলিতে বিভিন্ন পেশার মানুষ বসবাস করত। শাসক শ্রেণি, প্রশাসক গােষ্ঠী, শিল্পী ও কারিগর শ্রেণি, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ প্রভৃতি নানা ধরনের মানুষ শহরবাসী ছিল। নাগরিক সমাজে কারিগর ও শিল্পীদের তেমন মর্যাদা ছিল না। কারিগর শ্রেণির মধ্যে পড়ত হিন্দু ও মুসলিম তাঁতি, মুচি, তেলি, কামার, স্বর্ণকার প্রভৃতি মানুষেরা।
[2] ব্রিটিশদের জাতিগর্ব: কুসংস্কারমুক্ত মন নিয়ে এবং যুক্তিবাদের আলােকে স্নাত হয়ে ইংরেজরা নিজেদেরকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক সভ্য জাতি হিসেবে ঘােষণা করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা প্রাচ্যের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
[3] ভারতীয়দের সম্পর্কে ব্রিটিশের মনােভাব: ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয়রা ছিল শাসক ব্রিটিশদের কাছে কালাে চামড়ার মানুষ। শাসক ব্রিটিশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই বর্ণবিদ্বেষপ্রসূত জাতিভেদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছিল। শাসক ইংরেজদের কাছে শাসিত ভারতীয়রা ছিল ঘৃণ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অর্ধবর্বর। চার্লস গ্রান্ট তাই লিখেছিলেন, "ভারতীয়রা হল একটি ঘৃণিত ও শােচনীয়ভাবে অধঃপতিত এক জাতি।” ঔপনিবেশিক ভারতের কোনাে কোনাে ইউরােপীয় ক্লাবে নােটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হত যে, 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ'।
[1] সরকারি ক্ষেত্রে:
শাসনব্যবস্থায়: ভারতে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় সামরিক ও প্রশাসনিক স্তরের উচ্চপদগুলিতে শিক্ষিত ভারতীয়দের নিয়ােগ না করার প্রথা চালু ছিল। ইংল্যান্ডের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ভারতীয় পরীক্ষার্থীদের একযােগে পরীক্ষা নিতে হবে—ভারতীয়দের এই দাবি দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে উপেক্ষিত থাকে। শাসনবিভাগের প্রতিটি স্তরে এই জাতিবিদ্বেষ ছিল এক সাধারণ ঘটনা। ব্রিটিশ শাসকগণ জাতিবিদ্বেষের কথা খােলাখুলি প্রচার করত।
বিচার ব্যবস্থা: ঔপনিবেশিক ভারতের শ্বেতাঙ্গপ্রধান আদালতগুলিকে ব্রিটিশ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। অন্যায়কারী শ্বেতাঙ্গরা নামমাত্র জরিমানার বিনিময়ে মুক্তি পেত। ইংরেজ মনিব ভারতীয় চাকরকে বা চা বাগানের সাহেব তার কুলি বা কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে নামমাত্র জরিমানায় মুক্তি পেয়েছে, এরকম প্রচুর নিদর্শন আছে। উল্লেখ্য আগ্রায় ফুলার নামে এক ইংরেজ তার সহিসকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এবং ৩০ টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পায়।
[2] আর্থিক ক্ষেত্রে: আর্থিক ক্ষেত্রে ব্যাবসা বা বাণিজ্যিক প্রতিযােগিতায় সবসময় শ্বেতাঙ্গরা ভারতীয়দের তুলনায় অধিক সুযােগসুবিধা পেত। শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের আর্থিক সুরক্ষার জন্য নানা বণিকসভা, ব্যবসায়ী সমিতি এবং সংগঠন গড়ে তােলে। এক্ষেত্রে ইংরেজদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, তা হল শাসিত ভারতীয়দের আর্থিক দিক থেকে আরও দুর্বল করে দেওয়া।
[3] সামাজিক ক্ষেত্রে:
সংরক্ষণ: রেলের প্রতীক্ষালয়, পার্ক, ক্লাব, স্টিমার, হােটেল সর্বত্র ইউরােপীয়দের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকত। কোনাে ইউরােপীয় যাত্রী থাকলে টিকিট কাটা সত্ত্বেও কোনাে ভারতীয় যাত্রী রেলের সেই কামরায় ওঠার অধিকার পেতেন না।
অপমান: সাধারণ ভারতীয় নাগরিক এবং স্বনামধন্য ভারতীয় ব্যক্তিত্বরাও ব্রিটিশের কাছে পদে পদে অপমানিত হতেন। ইংরেজ অফিসারদের সামনে দিয়ে কোনাে ভারতীয় ঘােড়া, হাতি বা পালকি চড়ে যেতে পারতেন না। রাজা রামমােহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মতাে ব্যক্তিত্বরা পর্যন্ত পালকি চড়ে যাওয়ার অপরাধে ব্রিটিশের কাছে অপমানিত হন। চটিজুতাে পরার অপরাধে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কলকাতা জাদুঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
উপসংহার: জাতিবিতর্ক ও জাতিবৈষম্য ভারতে ব্রিটিশ বিরােধিতার এক অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল।
2.উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে হবসন ও লেনিনের তত্ত্ব আলোচনা কর। ৪ + ৪ = ৮
অথবা,
নয়া সাম্রাজ্যবাদ কী? হবসন-লেনিন থিসিস বলতে কী বোঝ ? এ বিষয়ে হবসন ও লেনিনের মতামত ব্যাখ্যা কর। ২[১+১] + ৩ + ৩ = ৮
অথবা,
ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে হবসন-লেনিনের তত্ত্বের বৈশিষ্ট বিশ্লেষণ কর। এই তত্ত্বের গুরুত্ব লেখো। ৩ +৩ + ২ = ৮
হবসন-লেনিন থিসিস :
আধুনিক বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি কোনো দেশের ভুখন্ড দখল না করেও সুকৌশলে সে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছে। ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের এই আধুনিক কৌশল 'নয়া সাম্রাজ্যবাদ' বা 'নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদ' নামে পরিচিত।
নয়া সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া ঔপনিবেশিকতাবাদের প্রসারকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। উদারনৈতিক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জে. এ. হবসন ও ভি. আই. লেনিন সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁদের এই অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা 'হবসন-লেনিন থিসিস' বা 'হবসন-লেনিন তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
এই তত্ত্বের মূলকথা হল --
বাড়তি মূলধনের চাপই সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশ দখলের মূল কারণ। এই বাড়তি মূলধন বা সম্পদের চাপ সম্পদের সুষম বন্টন ও অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে কাটানো যায় ( হবসন )
সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ সম্প্রসারিত রূপ। অর্থাৎ পুঁজিবাদের জঠরেই সাম্রাজ্যবাদের জন্ম। পুঁজিবাদী অর্থনীতিই হল যুদ্ধের জন্মদাতা। এই পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য পুঁজিপতিরা অনুগত অভিজাত শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করে ( লেনিন )
হবসনের মতবাদ ও তার বৈশিষ্ট্য:
১৯০২ সালে প্রকাশিত তাঁর 'সাম্রাজ্যবাদ --- একটি সমীক্ষা' গ্রন্থে বলেছেন ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ ছিল পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলিতে বিকশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বাভাবিক পরিণতি। তিনি তাঁর গ্রন্থে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে :
উদ্বৃত্ত পুঁজির সৃষ্টি : হবসনের মতে, ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় পুঁজিপতি মালিকদের হাতে বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর মূলধন সঞ্চিত হয়। এই পাহাড় প্রমাণ মূলধন সৃষ্টি হওয়ার প্রধান কারণ হল সমাজে ধনসম্পদ বন্টনে ব্যাপক বৈষম্য।
পুঁজিপতিদের চাপ : এই পাহাড় প্রমাণ 'বাড়তি মূলধনের চাপ-ই সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশ দখলের মূল কারণ। পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের উদ্বৃত্ত (বাড়তি) মূলধন উপনিবেশে বিনিয়োগ করে আরও মুনাফা অর্জনের পরিকল্পনা করে।
উপনিবেশ দখল : এজন্য তারা নিজ নিজ দেশের সরকারকে উপনিবেশ দখলে বাধ্য করে।
আরও মুনাফা অর্জনের চেষ্টা : হবসন মনে করেন, উপনিবেশ দখলের পর পুঁজিপতি শ্রেণি সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহ, উচ্চমূল্যে পণ্য বিক্রির বাজার দখল ও উদবৃত্ত মূলধন লগ্নির মাধ্যমে আরও বাড়তি মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও ফুলেফেঁপে ওঠে।
ঔপনিবেশিকতাবাদ অবসানের উপায় : হবসন মনে করেন, এই উপনিবেশ দখলের ঘটনা প্রতিহত করা যায়। তাঁর মতে, পুঁজিপতিদের বাড়তি মূলধন দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যয় করলে তারা উদবৃত্ত পণ্য সামগ্রী কিনে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে এই উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ দখলের প্রয়োজন হবে না।
লেনিনের মতবাদ ও তার বৌশিষ্ট :
রুশ কমিউনিস্ট নেতা ভি. আই. লেনিন ১৯১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর 'সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর' গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে,
বিপুল পুঁজির উদ্ভব : শিল্পের অগ্রগতির ফলে ইউরোপের দেশগুলির মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে বিপুল পুঁজি সঞ্চিত হয়। এই সঞ্চিত পুঁজি লাভজনকভাবে বিক্রি করার জন্য এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি ইউরোপের পুঁজিপতিরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দখল করে এবং সেখানে পুঁজি লগ্নির উদ্যোগ নেয়।
বাজার দখল ও কাঁচামাল সংগ্রহ : লেনিনের মতে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শিল্পমালিকরা বেশি লাভের আশায় দেশের চাহিদার চেয়ে বেশি পণ্য সামগ্রী উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি ও শিল্পোৎপাদনের জন্য সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি উপনিবেশ দখলের চেষ্টা চালায়।
পুঁজি বিনিয়োগ : তবে লেনিন উপনিবেশ প্রসারের ক্ষেত্রে শিল্পে পুঁজি বিনিয়গের চেয়ে উপনিবেশে মূলধন বিনিয়োগের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, পুঁজিপতি শ্রেণি উপনিবেশগুলিতেই পুঁজি বিনিয়োগ করে এবং সেখানেই পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করার চেষ্টা চালায়। তাই, লেনিনের মতে, 'সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ সম্প্রসারিত রূপ।'
উপনিবেশ দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা : বিভিন্ন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির উপনিবেশ দখলকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এই প্রতিযোগিতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল যুদ্ধ। লেনিনের মতে, 'পুঁজিবাদী অর্থনীতি হল যুদ্ধের জন্মদাতা।' আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল পুঁজিবাদী শক্তিগুলি কতৃক উপনিবেশ দখলের লড়াই।
অনুগত শ্রমিক শ্রেণির জন্ম : লেনিনের মতে, পুঁজিবাদী দেশগুলি এশিয়া ও আফ্রিকার শ্রমিক শ্রেণীর ওপর সীমাহীন শোষণ চালায়। ফলে তারা বিপুল পরিমাণ মুনাফা লাভ করে। এই লাভের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজের দেশের শ্রমিকদের উৎকোচ দিয়ে একধরনের অনুগত 'অভিজাত শ্রমিক শ্রেণি' তৈরী করে। এরা বিপ্লবের কথা ভুলে গিয়ে বুর্জোয়াদের সমর্থন করে।
মূল্যায়ন :
হবসন-লেনিন তত্ত্বের ত্রুটি :
সুতরাং বাড়তি পুঁজির চাপ এবং তার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশবাদের সম্পর্ক বোঝাটা সহজ হয়ে যায় এই তত্বের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এর কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন চিন্তাবিদরা। যেমন --
উপনিবেশের বাইরে বিনিয়োগ : অধ্যাপক জে. ডি. ফেজ দেখিয়েছেন, ১৯১৩ সালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ও জার্মানি কর্তৃক বিনিয়োগ করা অর্থের সিংহভাগই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেই সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব হয় নি।
শিল্পবিল্পবের পূর্বে উপনিবেশ : শিল্পবিপ্ল্ব ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির উদ্ভব ও বিকাশ হয় ঊনিশ শতকে। অথচ এর আগে কেন উপনিবেশের উদ্ভব ঘটলো তার কোনো ব্যাখ্যা হবসন-লেনিন তত্ত্বে পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্সের উপনিবেশ বৃদ্ধির ব্যাখ্যা : ১৮১৫ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ফ্রান্সের উপনিবেশ বৃদ্ধির হার ছিল অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ। শিল্পে পিছিয়ে থাকা দেশ ফ্রান্সের উপনিবেশ বৃদ্ধির যথার্থ কারণ এই ব্যাখ্যায় পাওয়া যায় না।
শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান : লেনিনের মতে, শিল্পোন্নত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অনেকটাই ভালো হয়। কিন্তু তাহলে ডেনমার্ক, সুইডেন প্রভৃতি উপনিবেশ না থাকা দেশের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান ফান্স ও বেলজিয়ামের মত সাম্রাজ্যবাদী দেশের চেয়ে উন্নত হয় কিভাবে?
দুদেশের সুসম্পর্কের উল্লেখ : ব্রিটেনের হাতে বিপুল পুঁজি থাকা সত্ত্বেও তারা কানাডা অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশের স্বাধীনতা দিয়েছিল। কারণ, তারা বুঝেছিল উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা নয়, দুদেশের সুসম্পর্কের দ্বারাও অধিক পুঁজি বিনিয়োগ সম্ভব। কিন্তু হবসন-লেনিনের তত্ত্বে এই সুসম্পর্কের কোনো উল্লেখ নেই।
মৌলিকত্বের অভাব : ডেভিড টমসন দেখিয়েছেন লেনিনের তত্ত্ব মৌলিক ও সম্পূর্ণ নয়।
গুরুত্ব বা তাৎপর্য :
এই সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও একথা মানতেই হবে সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখ্যা হিসাবে এই তত্ত্ব নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। ডেভিড টমসন তাই এই তত্ত্বের মৌলিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও উপনিবেশ দখলের অর্থনৈতিক তাগিদকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, 'ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপীয় দেশগুলি কতৃক সাগরপারে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র সন্ধানের আগ্রহ তাদের উপনিবেশ দখলে বিশেষ উদ্যোগী করে তুলেছিল।' প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলে প্রায় ত্রিশ হাজার মিলিয়ন ডলার পুঁজি বিনিয়োগ তার প্রমাণ।
3. সাম্রাজ্যবাদ বলতে কী বোঝায়? সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণ লেখো।
সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞা:
যদিও সাম্রাজ্যবাদের নির্দিষ্ট কোনাে সংজ্ঞা নেই তা সত্ত্বেও বলা যায় যে সাম্রাজ্যবাদ বলতে প্রকৃতপক্ষে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপনকে বােঝানাে হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদ বলতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র দ্বারা দুর্বল। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিনাসকে বােঝানাে হয়ে থাকে।
সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণ:
সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণটি এক বিতর্কিত বিষয়। কোনাে একটি নির্দিষ্ট কারণে সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব হয়নি। সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের একাধিক কারণের মধ্যে বলা যায় –
(A) অর্থনৈতিক কারণ:
উনিশ শতকে সাম্রাজ্যবাদের উত্থানের পশ্চাতে অর্থনৈতিক কারণগুলি হলাে –
(i) কাঁচামাল সংগ্রহ : উনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পবিপ্লব ও শিল্প উন্নতির ফলে ইউরােপের শক্তিশালী দেশগুলিতে বৃহৎ আয়তন কলকারখানা স্থাপন এবং দ্রুত উন্নতি বৃদ্ধির ফলে কাঁচামালের প্রয়ােজন দেখা দেয়, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে এই কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদী লড়াই।।
(ii) বাজার দখল : অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করার জন্য ইউরােপের প্রত্যেক রাষ্ট্রই নিজ নিজ দেশের শিল্প বৃদ্ধিকল্পে সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করে। ফলে শিল্পজাত দ্রব্যের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে। সুতরাং এই সমস্ত দ্রব্য সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য বৃহত্তর বাজার প্রয়ােজন হয়।
(iii) বেকারত্ব : কলকারখানা স্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুটিরশিল্প বিনষ্ট হয়। এবং কৃষিকার্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, খাদ্য সংকট ও বেকারত্বের চাপ বহিঃবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
(B) রাজনৈতিক কারণ:
(i) জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা : জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকেও সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য দায়ী করা যেতে পারে।।
(ii) রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা : অনেক সময় বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র সাম্রাজ্য স্থাপনকে জাতীয় দম্ভ বা জাতিগত গৌরব বলে মনে করত। আসলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা জাহির করার জন্য দুর্বল রাষ্ট্রগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণে লিপ্ত থাকত।
(C) সামাজিক কারণ:
(i) উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার পুনর্বাসন : উনিশ শতক থেকে ইউরােপে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলানাে ও বাড়তি জনগণের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের জন্য অনেক সময় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি নতুন নতুন ভূখণ্ড দখলে লিপ্ত হতে শুরু করেছিল যা সাম্রাজ্যবাদের উত্থানে সহায়ক ছিল।
(ii) জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা : অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দোহাই দিয়ে। বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্র দখলে ব্যস্ত থাকত যা সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটাতে সাহায্য করেছিল।
সাংস্কৃতিক কারণ:
অনেক সময় পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া অংশে সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলাে পৌঁছে দেওয়ার বাণী শুনিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপােষকরা সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটায়।
4. মার্কেন্টাইল অর্থনীতি বলতে কী বোঝো? এই নীতির বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
অথবা, মার্কেন্টাইল মূলধন বলতে কী বোঝো? এই মতবাদের প্রধান বক্তব্যগুলি কী কী?
সূচনা:ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে যে অর্থনীতি মতবাদের সৃষ্টি হয় তা মার্কেন্টাইল বাদ নামে পরিচিত। নিরিবিচ্ছিন্ন ভাবে কোন অর্থনীতিবীদ বা রাষ্ট্র এই মতবাদের প্রবর্তক ছিল না। এই মতবাদে মূলত মূল্যবান ধাতুকে সংরক্ষণের কথাই বলা হয়েছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ তার ‘ওয়েলথ অফ নেশন’ গ্রন্থে প্রথম এই অর্থনীতি ব্যাবস্থার নাম দিয়েছিলেন মার্কেন্টাইল বাদ।
বৈশিষ্ট্য:-
i) অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ→
এই প্রথম রাষ্ট্রের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং বণিক ও উৎপাদকের স্বার্থ অভিন্ন বলে বিবেচিত হতে শুরু করে।
ii) আমদানি হ্রাস ও রপ্তানি বৃদ্ধি→
এই মতবাদের মূল বক্তব্যই ছিল সম্পদের সম্পূর্ণ সৎ ব্যাবহার করা। এবং এই উদ্দেশ্যেই আমদানি কমিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি করা হয়।
iii) সোনা ও রুপোর গুরুত্ব→
এই নীতি অনুসারে সোনা ও রুপোর ভান্ডার বৃদ্ধি করার উপর জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি নির্ভরশীল। যে সকল দেশে এই ভান্ডার কম তাদের রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হবে।
iv) অবাধ বাণিজ্যের বিরোধিতা→
এই মতবাদীরা অবাধ বাণিজ্যের বিরোধী ছিলেন। তারা মনে করতেন, অন্য দেশের স্বার্থ খুন করাই স্বদেশের সমৃদ্ধ সম্ভব। এই উদ্দেশ্যে বহু নিষেধাজ্ঞা জারি, আমদানি, শিল্প চাপানো, একচেটিয়া বাণিজ্য ইত্যাদি বৃদ্ধি পাই। এর ফলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান শুরু হয়।
v) উপনিবেশ স্থাপন→
এই নীতি অনুসারে ইউরোপীয় দেশগুলি কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ দখল করতে থাকে। এবং এই উপনিবেশে নিজেদের অধিপত্য বজায় রাখার জন্য নৌবহর গঠন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন প্রকৃতি করতে থাকে।
মূল্যায়ণ→
পরিশেষে বলা যায় মার্কেন্টাইল বাদ যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করলেও এই অর্থনীতি মতবাদ ছিল ভুল ও ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। এডাম স্মিথ এছাড়াও আরো অনেকে অর্থনীতিবিদ গণ বলেছেন সঞ্চিত অর্থ ও সম্পদের ভাণ্ডার বৃদ্ধি করা প্রাকৃতিক দ্বারা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।
.....................
skacademyallinone.blogspot.com

